Saturday 05 Apr 2025
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

স্মার্ট আকাশপথের নতুন দিগন্ত

তাপস হালদার
৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:০৭ | আপডেট: ৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:১৬

বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন করে বলেছেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একসময় বাংলাদেশই হবে সারা বিশ্বের যোগাযোগের হাব। এক সময় আন্তর্জাতিক হাব ছিল হংকং। এরপর হলো সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড,এখন দুবাই। আমি বিশ্বাস করি একসময় কক্সবাজার ও হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর হবে আন্তর্জাতিক হাব। রিফুয়েলিংয়ের জন্য অনেকেই এখানে আসবে, থামবে; বাংলাদেশের সৌন্দর্য উপভোগ করবে।’ প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতের কথা ভেবেই একদম সম্পূর্ণ আঙ্গিকে বিশ্বসেরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো তৃতীয় টার্মিনালটি নির্মান করেছেন।

বিজ্ঞাপন

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করে। দেশের প্রধান বিমানবন্দরের দুইটি টার্মিনাল প্রতিদিন প্রায় ৩০ টি এয়ারলাইন্সের ১২০ থেকে ১৩০ টি ফ্লাইট উঠানামা করে। প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার বিমানবন্দরটি ব্যবহার করে। এতসংখ্যক যাত্রীকে মানসম্মত সেবা দেওয়া দুইটি টার্মিনালের পক্ষে যথেষ্ট ছিলনা। এজন্য নতুন একটি বিমানবন্দর কিংবা একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন টার্মিনালের খুব প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। যার কারণেই মূল টার্মিনালের দক্ষিণ পার্শ্বে তৃতীয় টার্মিনাল তৈরি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ও জাপানের যৌথ অর্থায়নে টার্মিনালটি তৈরি হয়েছে। ব্যয় ধরা হয় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে জাইকা ঋণ দিয়েছে ১৬ হাজার ১৪১ কোটি, সরকার দিয়েছে ৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের সময়কাল ধরা হয়েছিল চার বছর। অথচ তিন বছর নয় মাসেই তা সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটিও একটি মাইলফলক।

তৃতীয় টার্মিনালের নকশা করেছেন আন্তর্জাতিক স্থাপত্যবিদ সিঙ্গাপুরের রোহানি বাহারিন। তিনি সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর টার্মিনাল -৩, চীনের গুয়াংজুর এটিসি টাওয়ার ভবন, ভারতের আহমেদাবাদ ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ বিমানবন্দর মতো আধুনিক বিমানবন্দরের নকশা করেছেন। এছাড়া মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ব্রুনেই, মিয়ানমার, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরের নকশা করেছেন।

বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও সর্বোচ্চ মানসম্মত বিমানবন্দর বলা হয় সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরকে। যার ২০২৩ সালের রেটিং স্কোর ৯০ দশমিক ১২। দ্বিতীয় অবস্থান তুরস্কের ইস্তাম্বুল। তারপর যুক্তরাজ্যের হিথ্রো, সুইজারল্যান্ডের জুরিখ সহ বিভিন্ন দেশের আরো অনেক বিমানবন্দর। এসব বিমানবন্দরের রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যাতে করে যাত্রীদের কোনো প্রকার ভোগান্তি না হয়, তা নিশ্চিত করা। একজন যাত্রী যাতে সব ধাপ অতিক্রম করে বিমানে উঠতে পারে এবং একই ভাবে আরামদায়ক প্রস্থান করতে পারে। নান্দনিকতায় তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়িয়ে গেছে থ্যাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি ও তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরকেও।

তৃতীয় টার্মিনালে ২ লাখ ২৬ হাজার বর্গমিটার অত্যাধুনিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন আছে। এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে চেক-ইন কাউন্টারে গিয়ে বোডিং পাশ ও ব্যাগেজ বুকিং দিতে হবে না। ১০ টি সেলফ চেক-ইন মেশিন আছে সেখানে পাসপোর্ট ও টিকিটের তথ্য প্রবেশ করালে স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলে আসবে বোডিং পাশ ও আসন নাম্বার। এরপর যাত্রী নির্ধারিত জায়গায় লাগেজ রাখলেই এয়ারক্রাফটের নির্ধারিত জায়গায় চলে যাবে। বহির্গমণের পথে ১০ টি ই-গেট আছে। সেখান দিয়ে যাত্রীরা ইমিগ্রেশন পুলিশের মুখোমুখি না হয়ে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারবেন। তবে তাদের ই-পাসপোর্ট থাকতে হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ৪০-৫০ সেকেন্ডের মধ্যেই যাত্রী ইমিগ্রেশন শেষ হবে। কেউ ভুল করলে লালবাতি জ্বলে উঠবে। তখন তাকে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা সহযোগিতা করবেন। এককথায় সম্পূর্ণ ডিজিটাল সুবিধা থাকবে।

যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বহির্গমণ পথে ১০ টি স্বয়ংক্রিয় ই-গেট, আর আগতদের জন্য আরো ৫ টি ই-গেট। ৬৪টি বহির্গমণ ও ৬৪টি আগমনী ইমিগ্রেশন ডেক্স থাকবে। যাত্রীদের তল্লাশি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে, বডি স্ক্যানার যন্ত্রে স্বয়ংক্রিয় ভাবেই তল্লাশি চলবে।

যেসকল নাগরিক দীর্ঘপথ হাঁটতে অক্ষম, তাদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ৩৫টি স্ট্রেইট এক্সেলেটর আছে,যা বাংলাদেশে প্রথম। সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, দুবাই সহ আধুনিক বিমানবন্দরে যাত্রী সেবার জন্য এধরনের এস্কেলেটর ব্যবহার করা হয়। মুভিং ওয়াকওয়ে ১২টি ও এলিভেটর আছে ৪৩টি।

প্রতিটি ওয়াশরুমের সামসে শিশুদের খেলার জন্য একটি বেবিকেয়ার লাউঞ্জ থাকবে। এবং এরমধ্যে মায়ের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং বুথ, ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা ও একটি বড় ফ্যামিলি বাথরুম আছে। বাচ্চাদের জন্য স্পিপার-দোলনাসহ একটি চিলড্রেন খেলার এলাকা, স্বাস্থ্যসেবার জন্য সার্বক্ষণিক দক্ষ চিকিৎসকসহ হেলথ ইন্সপেকশন সুবিধা, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ফার্স্ট এইড রুম, করোনাসহ নানাবিধ রোগ পরীক্ষা জন্য পরীক্ষাগার ও আইসোলেশন সেন্টার। অপেক্ষারত যাত্রীদের একঘেয়েমি দূর করতে আছে মুভি লাউঞ্জ, ফুড কোর্ট, এয়ারলাইন্স লাউঞ্জ, ডে-রুম। কেনাকাটার জন্য আছে ১৪ টি স্পটে ডিউটি ফ্রি শপ। এছাড়া টার্মিনালের ভেতরে-বাইরে আছে ফুড কোর্ট, ফুড গ্যালারি, ওয়াই-ফাই ও মোবাইল চার্জিং সুবিধা। যাত্রীদের বিদায় কিংবা আনতে যাওয়া দর্শনার্থীদের জন্য মিটার্স অ্যান্ড গ্রিটার্স প্লাজাও আছে।

একজন যাত্রী টার্মিনালের থেকে বিমানে উঠা পর্যন্ত হাতের স্পর্শ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় ভাবে তল্লাশি হওয়ার কারণে যাত্রী ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীদের সময় বাঁচবে। এবং স্ক্যানিং হবে স্বচ্ছ ও নির্ভুল।

আমদানি ও রপ্তানি পন্যের জন্য উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন ৬৩ হাজার বর্গমিটার এলাকা নিয়ে কার্গো ভিলেজ তৈরি করা হয়েছে। যার ধারণ ক্ষমতা ৪ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে পরিবহন করা কার্গোর প্রায় ৬০ শতাংশ যাত্রীবাহী পরিবহনে হয়। বাকি ৪০ ভাগ পন্য এক্সক্লুসিভ কার্গোতে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বছরে প্রায় ৮৪ হাজার টন।নতুন টার্মিনাল নিয়ে সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় পৌঁনে তিন লাখ টন। এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভুমিকা পালন করবে।

বিশ্বমানের এই টার্মিনালে ১ হাজার ৪৪ টি গাড়ি রাখার সক্ষমতা সহ বহুতল গাড়ী পার্কিং তৈরি করা হয়েছে। এখানে একসঙ্গে ৩৭ টি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যাবে। ১৬ টি ব্যাগেজ বেল্ট স্থাপন এবং অতিরিক্ত ওজনের জন্য চারটি পৃথক বেল্ট আছে। একটি করিডোর দিয়ে পুরনো দুইটি সাথে টার্মিনালের সাথে নতুন টার্মিনালের সংযোগ করা হয়েছে।

বিমান বন্দরে পৌঁছাতে আর যানযট নিয়ে আতঙ্কিত হতে হবে না। তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মেট্রোরেল ও উড়ালসড়কের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে যেকোনো যাত্রী ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে কোন প্রকার যানযট ছাড়াই টার্মিনালে পৌঁছাতে পারবেন। যারা বিমানবন্দর থেকে বের হবেন তারা রাম্প ব্যবহার করে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে যাবেন। একই ভাবে এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে গাজীপুর দিয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যেতে পারবেন। মেট্রোরেলের সাথে সংযোগ আছে টার্মিনালের। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই মেট্রোরেলে যেকোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন,আবার মেট্রো রেলের যেকোনো স্টেশন ব্যবহার করে তৃতীয় টার্মিনালে পৌঁছাতে পারবেন। মেট্রোরেলের সংযোগটি তৃতীয় টার্মিনাল থেকে নতুন বাজার, বাড্ডা হয়ে দীর্ঘ ৩১ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে অনায়াসে কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছে যাবে। বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে তৃতীয় টার্মিনাল পর্যন্ত একটি ভূগর্ভস্থ রাস্তা তৈরি হবে। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে রেলস্টেশনে পৌঁছাতে পারবেন। একইভাবে ট্রেন থেকে নেমে রাস্তাটি ব্যবহার করে টার্মিনালে পৌঁছাতে পারবেন। আশকোনা হজ ক্যাম্প থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের মাধ্যমে হজযাত্রীরা টার্মিনালে যেতে পারবেন। এককথায় তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে একটি যানযট মুক্ত পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। যার ফলে আর যাত্রীদের ফ্লাইট মিসের আশঙ্কা থাকবে না। সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।

২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য,স্মার্ট আকাশ পথের বিকল্প নেই। তৃতীয় টার্মিনালের আধুনিকায়ন তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

লেখক:সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

সারাবাংলা/এসবিডিই

টপ নিউজ তাপস হালদার মত-দ্বিমত স্মার্ট আকাশ পথের নতুন দিগন্ত