Friday 04 Apr 2025
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইউক্যালিপটাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেভাবে

মীর্জা মো. নাসির উদ্দিন
১৯ নভেম্বর ২০২৪ ১০:২৫ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০২৪ ১৪:২৩

বাংলাদেশের রাস্তার পাশে লাগানো ইউক্যালিপটাস গাছ। ছবি: সংগৃহীত

মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মতো বিদ্যুৎ একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রযুক্তিগত চাহিদা। বিদ্যুৎ ছাড়া সকল যান্ত্রিক জীবন অচল। সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। এই জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ সবকিছুই ব্যয়বহুল এবং এটি মাত্র কয়েকটি দেশেই সীমাবদ্ধ। ফলে অন্য দেশগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি পরিবেশগত মূল্যায়নেও অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত ১৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। জীবাশ্ম জ্বালানির দহনের ফলে পরিবেশে বিপুল পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাপী পরিবেশবিদগণ জলবায়ু পরিবর্তনে জীবাশ্ম জ্বালানিকে দায়ী করেছে এবং এটি প্রশমন করা না গেলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সেজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং যানবাহন চালনায় আজকাল জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বিভিন্ন রকম নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং নতুন উৎসের সন্ধান অব্যাহত আছে। তেমনি একটি উৎস ইউক্যালিপটাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হয়েছে। ইউক্যালিপটাসের বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন ধরণের অর্থনৈতিক ও ঔষধি গুণ থাকা সত্ত্বেও এ গাছটিকে নিয়ে পরিবেশগত বিশ্লেষণে অনেকে বিরুপ মনোভাব পোষণ করছে। আবার এ গাছ নিয়ে বিশ্বব্যাপী যত গবেষণা হয়েছে অন্য গাছ নিয়ে এরকম গবেষণা নাই বললেই চলে। আমাদের মতো দেশে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে ইউক্যালিপটাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলে কৃষক উপকৃত হবে এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। সেক্ষেত্রে ইউক্যালিপটাস নিয়ে ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ করলে ভালোর দিকটাই যে বেশি তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘থ্রি জিরো বা তিন শূন্য’ তত্ত্বের অন্যতম একটি হলো শূন্য কার্বন যা বলতে বোঝায় জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে শুধু পুনঃনবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে জাতিসংঘের কনফারেন্স অব দ্যা পার্টিজ-২৯(কপ-২৯) সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে এগিয়ে যেতেই হবে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কর অব্যহতির কথা ঘোষণা করেছেন। গ্রিন এনার্জির অংশ হিসেবে জামালপুরে ২০ হাজার একর সুবিশাল সরকারি খাস জমি ও জলাশয়ের ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম সোলার বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পার্ক। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অন্তত ৪০টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে চীন ১৪১ গিগাওয়াট, ভিয়েতনাম ১৬.৫০ গিগাওয়াট, ভারত ১৫. ৭ গিগাওয়াট এবং বাংলাদেশ ১.০৮৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আমাদের দেশে ৫০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। জার্মানি ও বাংলাদেশের সৌরশক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, জার্মানির যে কোনও জায়গায় সূর্য থেকে আসা সর্বোচ্চ সৌরশক্তিও বাংলাদেশের চেয়ে কম। এছাড়া দেশে বাতাস থেকে ১ হাজার এবং বর্জ্য থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কেনিয়ার ইউক্যালিপটাস পাল্প মিলের ফেসবুক পেইজ থেকে নেওয়া ছবি। ছবি: ফেসবুক থেকে

বাংলাদেশ সরকার দেশের বিদ্যুৎখাতে ব্যবহৃত জ্বালানির ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সারাবিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গড় ব্যবহার ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হলেও বাংলাদেশে এই হার ৪ শতাংশ। ২০১৯-২৩ সালের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ১৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৪১৯ গিগাওয়াট হয়েছে। বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে গত বছর মোট উৎপাদন এক হাজার ১৭ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে।

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, সহজলভ্যতার অনিশ্চয়তা, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ব আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিভিন্ন ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে বিশ্বের কয়েকটি দেশ বিশেষ করে স্পেন, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, ঘানা, ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশ ইউক্যালিপটাস কাঠ/বায়োমাস ব্যবহার করে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে কাঠ গ্যাসীয়করণ এবং পাইরোলাইসিস পদ্ধতিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বেশ সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। কাঠ গ্যাসীয়করণ হলো থার্মো রাসায়নিক পদ্ধতি যার মাধ্যমে কাঠের চিপস থেকে উৎপন্ন পদার্থ জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয়ে গ্যাসে পরিণত হয় যাকে সিন গ্যাস বা সিনথেসিস গ্যাস বলা হয়। তারপর এ গ্যাসকে একটি অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন বা গ্যাস টারবাইনে আমদানি করা হয় এবং একটি পাওয়ার জেনারেটরের মাধ্যমে তাপ শক্তির সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পাইরোলাইসিস হলো অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে ইউক্যালিপটাসের বায়োমাস একটি বয়লারে জ্বালিয়ে উচ্চ চাপে বাষ্প তৈরী করা হয়। এই বাষ্পটি একটি টারবাইন ব্লেডের সিরিজের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় যার ফলে টারবাইনটি ঘুরতে থাকে। টারবাইনের ঘূর্ণনে একটি জেনারেটর চালিত হয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রচুর পরিমাণে ইউক্যালিপটাস গাছ উৎপন্ন হয়। এই ইউক্যালিপটাস গাছের রয়েছে প্রায় ৭০০ প্রজাতি। এর মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি রয়েছে যারা অস্ট্রেলিয়ায় মালি গাছ নামে পরিচিত এবং এ গাছগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ পার্থ এলাকার ন্যারোজিন ওয়েস্টার্ন পাওয়ার কোম্পানী ইন্টিগ্রেটেড উড প্রসেসর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউক্যালিপটাস বা মালি বৃক্ষ থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্নের একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত রয়েছে ‘Commonwealth Scientific & Industrial Research Organization’ এর অস্ট্রেলিয়ান সরকারের গবেষণা শাখা। এ প্রক্রিয়ায় বছরে ২০ হাজার টন ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে ৭০০ টন সক্রিয় কার্বন এবং ২০০ টন বায়ো তেল উৎপন্ন হয় যা দিয়ে বৈদ্যুতিক জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষণা সংস্থাটি এখানে বহুবিধ সুবিধার কথা উল্লেখ করেছে। তারা বলছে, অস্ট্রেলিয়ার যে এলাকায় এই গাছগুলো লাগানো হয়েছে সেখানকার জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা এই গাছগুলো দূরীভূত করছে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে সক্রিয় কার্বনের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে সক্রিয় কার্বন পানির রং, গন্ধ ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ দূর করে পানিকে বিশুদ্ধ করে এবং ইউক্যালিপটাস থেকে পাওয়া তেল পরিবেশের কোনও দূষণ ঘটাবে না। বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নিলে পেট্রোল বা ডিজেলের তুলনায় ইউক্যালিপটাস থেকে পাওয়া তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে তা হবে মূল্যসাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব।

‘The life energy Project’ ইউক্যালিপটাস প্লান্টেশন থেকে কম ঘনত্বের জৈব বস্তু সংগ্রহের জন্য একটি প্রক্রিয়া ডিজাইন করেছে যা কাটাইকৃত গাছগুলিকে পাইরোলাইজড করে উচ্চমানের বায়োচার উৎপন্ন করে। পাইরোলাইসিস প্রক্রিয়ায় বায়োচার থেকে উৎপন্ন সিনগ্যাস তখন বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনে কাজে ব্যবহৃত হয়। ২০১২ সালে স্পেনে কমিউনিটি ভর্তুকির মাধ্যমে একটি বৃহৎ বায়োমাস প্লান্ট তৈরী করা হয় যার মাধ্যমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং তা দিয়ে চার লক্ষ লোককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ‘Field performance of eucalyptus stands for bio energy Southern Spain’ এর প্রতিবেদন অনুসারে স্পেনের আন্দালুসিয়ায় ইউক্যালিপটাস ও অন্যান্য বায়োমাস থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে এ পদ্ধতিতে ১৬% বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়।

ব্রাজিলের প্রান্তিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা ইউক্যালিপটাসের সম্ভাব্য বৃহৎ মাপের জৈব শক্তি স্থাপনের একটি অনুমান দেখায় যে প্রতি বছর ৭ ইজে বা এক্সাজুল তাপ, ২.৫ ইজে বিদ্যুৎ এবং ৫ ইজে জুল পরিবহণ বায়োফুয়েল উৎপন্ন করা যেতে পারে। এটি ২০১৫ সালে বৈশ্বিক নৃতাত্ত্বিক নির্গমনের ০.৯% এবং ২.৪% এবং ইউরোপীয় নির্গমনের ৫.৭% থেকে ১৬% এর মধ্যে জলবায়ু প্রশমন সম্ভাবনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এটি বিবেচ্য নির্দিষ্ট জৈব শক্তি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে।

ব্রাজিলের বৃহত্তম ইউক্যালিপটাস পাল্প মিল সুজানো। ছবিটি হিটাচি এনার্জির পেইজ থেকে নেওয়া

নিকারাগুয়ার বিদ্যুৎ বিভাগ আখের মৌসুমে দু’টি চিনিকলের ব্যাগাসে থেকে এবং বছরের অন্য সময় ইউক্যালিপটাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির পরিকল্পনা করেছে। এই গবেষণায় জ্বালানি তেল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ ধারণাটিকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে যৌক্তিক বিকল্পের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সস্তা জমি, শ্রমের কম মূল্য, সামগ্রিক খরচ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব এবং পরিবেশগত নির্গমন বিবেচনায় ইউক্যালিপটাস তেলের উৎপাদন খরচ কম বলে প্রতীয়মান হয়। এভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে যা আয় হবে তা নিগারাগুয়ার জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অপরপক্ষে ডিজেল/পেট্রোলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়। ডিজেল/পেট্রোলচালিত পাওয়ার প্লান্টে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয় তার চেয়ে ৬৭ ভাগ কম কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস এবং ১৮ ভাগ কম সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয় ইউক্যালিপটাস থেকে পাওয়া বায়োফুয়েলে। এর পরও এটি উন্নত পরিবেশগত কর্মক্ষমতা, দ্বিগুণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপিতে প্রায় চারগুন বেশি অবদান রাখে।

গবেষণাপত্র ‘Eucalyptus wood for energy and the costs of carbon dioxide abatement in power and heat generation systems in Thailand’ -এর মতে থাইল্যান্ডে কৃষি এবং এর অবশিষ্টাংশ ছাড়াও ইউক্যালিপটাস বাগানগুলিকে জৈব বস্তুশক্তির একটি প্রধান সম্ভাব্য উৎস হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানির ভিত্তিমূল্য কয়লার জন্য ১.৫ ইউএস ডলার/গিগাজুল, জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে ২.৭ ইউএসডলার/গিগাজুল, প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩ ইউএস ডলার/গিগাজুল। ইউক্যালিপটাসের ক্ষেত্রে ২ ইউএস ডলার/গিগাজুল। ইউক্যালিপটাসের ক্ষেত্রে কয়লার চেয়ে কিছুটা মূল্য বেশি হলেও পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের মাত্রা খুবই কম এবং এ ক্ষেত্রে দেশের অর্থ দেশেই থাকায় জিডিপিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে কিনো, তেল ও ট্যানিন পাওয়া যায়। ইউক্যালিপটাস গাছের তেলের অনেক ব্যবহার রয়েছে, বিশেষত অ্যান্টিসেপটিক ও পরিষ্কারক হিসেবে। মশা নিধনেও এই তেলের ভূমিকা রয়েছে। ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ইউক্যালিপটাসকে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, অয়েনমেন্ট তৈরি করতে ব্যবহার করছে। চীন, গ্রিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে কয়েক শতাব্দী ধরে ইউক্যালিপটাস ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ইউক্যালিপটাসের তেলের জুড়ি নেই।

দাঁতের সমস্যাতেও ব্যবহার করা হয় ইউক্যালিপটাস থেকে তৈরি মাউথওয়াশ ও বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। মুখের ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সাহায্য করে ইউক্যালিপটাস। ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, ত্বকের ক্ষত সারাতেও ব্যবহার করা হয় ইউক্যালিপটাস থেকে তৈরি ওষুধ। কীটপতঙ্গ মারতেও ব্যবহার করা হয় ইউক্যালিপটাস। মশা তাড়াতেও ব্যবহার করা হয় ইউক্যালিপটাস থেকে তৈরি তেল। শ্বাসরন্ধ্রের নানা অসুবিধা দূর করে ইউক্যালিপটাসের তেল। বুকে কফ জমা, নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া, গলা ব্যথা, নাক বন্ধ থাকা, ব্রঙ্কাইটিস ও সাইনোসাইটিসের সমস্যায় এ তেল খুবই কাজের।

কষ্টসহিষ্ণু, অযত্নে বেড়ে উঠতে পারে এমন একটি গাছ ইউক্যালিপটাস। প্রায় রোগমুক্ত এ গাছটি বেড়ে ওঠে খুব দ্রুত। ভূমিধ্বস রোধেও গাছটির সুনাম রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, ৩৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর আগে এ গাছটির উৎপত্তি। গাছটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড়ও কম নয়। তবে আবাদী জমি, সরকারি বন, রাস্তার পাশে এ গাছ এককভাবে না লাগানোই ভালো। লবণাক্ত অঞ্চল, পরিত্যক্ত জমি, প্রান্তিক জমি যেখানে কোন ফসলই লাভজনক নয় সেখানেই এই গাছ লাগানো যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী এ গাছ থেকে কাগজ তৈরীর পাল্প এবং সর্বোপরি বিদ্যুৎ তৈরীর জ্বালানি উৎপাদন করা হচ্ছে ফলে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অনেকাংশে কমে যেয়ে সবুজ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমাদের দেশেও এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন একদিকে বাড়বে অন্যদিকে জ্বালানি তেল আমদানীতেও যে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয় তা-ও রোধ করা সম্ভব হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পরিহার করে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিপ্লবের সময়। গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা ও প্রকোপ কমাতে পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর যখন হিমশিম অবস্থা, ঠিক সেই সময় ইউক্যালিপটাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিবেশ রক্ষায় আশার আলো দেখাচ্ছে।

লেখক: অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ

সারাবাংলা/এসবিডিই

ইউক্যালিপটাস ইউক্যালিপটাস থেকে বিদ্যুৎ

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর