রাবি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের (রুয়া) সভাপতি, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘গণভোটের রায় বাতিল করার অনেক কারণ আছে। এবারের পার্লামেন্টে ১৩৩টি অধ্যাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পার্লামেন্টে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ তারা বাতিল করে দিয়েছে। এর মধ্যে একটা ছিল গুম-খুন কমিশন। আমরা এর বিরোধিতা করেছি। তারা (বিএনপি) আগের মতোই গুম-খুনের রাজনীতি করতে চায় বাংলাদেশে।’
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির আয়োজিত নবীনবরণ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তারা (বিএনপি) যে আইন করেছে, আমরা বলেছি, আগের অধ্যাদেশের মধ্যে ছিল, গুম-খুনের বিরুদ্ধে যাদের গুম-খুনের ব্যাপারে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে, সেই সংস্থা এর তদন্ত করতে পারবে না। কিন্তু সেইটা পরিবর্তন করে পুলিশ গুম করবে, খুন করবে, আবার এটার অভিযোগের তদন্ত করবে পুলিশ। আবার সেখানে বলা হয়েছে, কোনো অভিযোগকারী যদি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে তাদের জন্য ৫ বছর পর্যন্ত সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাহলে কোনো মানুষ অভিযোগ করতে যাবে? এগুলো করার উদ্দেশ্য কি? এগুলো করার উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশকে আবার স্বৈরাচারের দিকে নিয়ে যাওয়া। আবার ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যাওয়া।’
তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশ কোনো পরিবারের বাংলাদেশ নয়। এই বাংলাদেশ ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ কীভাবে পরিচালিত হবে, এটা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ। এর মধ্যে যদি কেউ ব্যত্যয় তৈরি করতে চায়, এর মধ্যে যদি কেউ অন্য কোনো চিন্তা করে, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ, বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে যেভাবে ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীকে এই বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করেছে, যারাই এই কর্মকাণ্ড করবে, তাদেরকেও বিতাড়িত হতে হবে।’
শিক্ষাঙ্গনে আদর্শ মানুষ গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাস ও অপসংস্কৃতিমুক্ত করা এবং ৫ আগস্টের পর শিক্ষাঙ্গনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একদল আদর্শ সৎ যোগ্য চরিত্র মানুষ তৈরি করার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদর্শ মানুষ তৈরি করার কোনো কারিকুলাম নাই, কোনো সিলেবাস নাই, তাই সে কাজটি ইসলামী ছাত্রশিবির স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকা পালন করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আমরা দেখেছি গত ১৬ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের অতিষ্ট ছিল। কিছুই করার ছিল না। গত ১৬ বছরে গেস্টরুম কালচার টর্চার সেল কালচার গণরুম কালচার জেন্ডারবাজির কালচার চাদাবাজির কালচার নেশাখুরের কালচার গোটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে ফেলেছিল। গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে এর পরিবর্তন হয়েছে এবং এই পরিবর্তনকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য অনেকেই ষড়যন্ত্র করছে।’
রাষ্ট্রব্যবস্থায় দলীয়করণ ও স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। এই বাংলাদেশের মানুষেরা আজ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কোনোকিছু করার সুযোগ পায় নাই। আমাদের আন্দোলন ছিল বৈষম্য, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি বর্তমান সরকারও একইদিকে ধাবিত হচ্ছে। তারা কি দলীয়করণ করছে না? মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের ইশতেহারে বলেছিলেন সকল ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। সমস্ত সিটি করপোরেশনে দলীয় লোকদেরকে বসানো হয়েছে। সমস্ত জেলা পরিষদে দলীয় লোকদেরকে বসানো হয়েছে। সমস্ত সরকারি কর্পোরেশন গুলিতে দলীয় লোকদেরকে বসানো হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনের আগে তো জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি সেটা ছিল না। তাই এমন একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে বাংলাদেশের মাটিতে আর কোন স্বৈরাচারের জন্ম না হতে পারে।’
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এত কষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তার থাকার সিটের বন্দোবস্ত করতে পারে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারে আর ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাহিরে থাকে। এই ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর থাকার বন্দোবস্ত বিশ্ববিদ্যালয় করতে পারে নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘পিএসসিতে হাজার হাজার কোটি টাকা বাজেট দেয়া হয় অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয় না। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় করা শিখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ছাত্রদের সাথে আলোচনা করে বলতে হবে আগামী ২ বছরের মধ্যে শতভাগ আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল। সমাপনী বক্তব্যে তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরা একটা কঠিন ভর্তি যুদ্ধের মাধ্যমে এখানে এসেছো। এখানে ভালো পথ যেমন আছে, তেমনই খারাপ পথও আছে। আশা করছি, তোমরা সঠিক পথে চলবে এবং তোমাদের সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত রাখবে।’
মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, ‘সকল অধিকার আদায়ে ইসলামী ছাত্রশিবির সবসময় তোমাদের সঙ্গে থাকবে। দুই হাজার শহিদের রক্তের বিনিময়ে যে কোটা প্রথার কবর দেওয়া হয়েছে, তা আর কখনো ফিরে আসতে দেওয়া হবে না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, শিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীসহ প্রায় ৪ হাজার নিবন্ধিত নবীণ শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।