Thursday 29 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ-মালেকের ছবি, ব্যবস্থা নেবে ঢাবি প্রশাসন

​কানজুল কারাম কৌষিক, ঢাবি করেসপন্ডেন্ট
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:২০ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩:২৮

ডাকসু সংগ্রহশালা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: ​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টাঙানো হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিতর্কিত ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবিও রাখা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসসহ সারা দেশেই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এমতাবস্থায় এক বিবৃতিতে প্রশাসনকে না জানিয়ে এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাবি প্রশাসন।

বিজ্ঞাপন

​সংগ্রহশালা সংস্কার ও ছবি পরিবর্তন

​ডাকসুর সংগ্রহশালাটি নতুন করে উদ্বোধন করেছে ডাকসু নেতারা। ডাকসুর বর্তমান নেতারা এই সংগ্রহশালা সংস্কার করেন। এতে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ছবি সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিও ছিল। উলটো সেখানে জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিতর্কিত ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি ঝুলিয়ে সেটাকে ‘শহীদ মালেকের’ ইতিহাস হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।

ছবি সরানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডাকসুর দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ইচ্ছে হয়নি তাই রাখিনি।’ এই বক্তব্যে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাংশের মাঝে আরও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের ’৭১ পরবর্তী বিভিন্ন বিতর্কিত ও সমালোচিত অংশগুলো রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

​ছাত্রদলের আলটিমেটাম ও প্রতিবাদ

ডাকসু সংগ্রহশালার ​এই ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এক বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা বলেন, ‘ডাকসু নেতৃত্ব ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির আদর্শ প্রচার করছে।’ এ পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদল ডাকসু নেতাদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়। তারা অবিলম্বে জিন্নাহর ছবি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়।

ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘বিতর্কিত ডাকসু থেকে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অধিকাংশ ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি তারা টাঙিয়েছে। আমরা এটা সহ্য করতে পারি না। এটা অপসারণ করা না হলে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অফিস ও ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যুত্থানকে স্মরণ করতে একটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করেছে। কিন্তু তার আগেই বিতর্কিত ডাকসু রাতের অন্ধকারে ডাকসু ও মধুর ক্যান্টিনের সামনে একটি স্তম্ভ করেছে। কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে আরেকটি করতে চাচ্ছে। এভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে কেউ যদি রাজনৈতিকভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তা আমরা মানব না।’

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘আজ মোহাম্মদ আলী জিন্নার ছবির মাধ্যমে ডাকসুকে কলঙ্কিত করেছে। যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হাসির পাত্র বানাচ্ছে, ভাষা আন্দোলনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

​ছবি ভাঙচুর ও জুতাপেটার ছবি প্রদর্শন

এদিকে ​সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডাকসুর সংগ্রহশালায় যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেন। এ সময় সাংবাদিকদের আবু তৈয়ব বলেন, ‘যে জিন্নাহ আমাদের মাতৃভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যে জিন্নাহ ১৯৪৮-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রেফতার করিয়েছিল, সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না। এই ডাকসুতে, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এই বাংলাদেশে জিন্নাহর মতো কোনো ভিলেন, গোলাম আজম-নিজামীর মতো কোনো ভিলেন আমাদের নায়ক হতে পারে না, নায়ক হতে দেব না।’

এর কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন ছাত্র ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়াসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে গোলাম আজমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি সেখানে টাঙিয়ে দেন। এ সময় অর্ক বড়ুয়া বলেন, ‘ডাকসু কারও বাপের একার না। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও বাংলাদেশের সবধরণের ইতিহাস রাখা হবে।’

যা বলছেন ডাকসু নেতারা

​সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার বিষয়ে ডাকসুর পক্ষ থেকে ব্যাখা দিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তিনি জানান, জিন্নাহকে সম্মান বা গৌরবান্বিত করতে এই ছবি রাখা হয়নি। বরং, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার বিতর্কিত ভূমিকাকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরতেই ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর পেছনে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়ে বাংলা ভাষার সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। তাই সঠিক ইতিহাস জানাতেই সেই বিষয়ের বিবরণসহ জিন্নাহর ছবি রাখা হয়েছিল।’

​এস এম ফরহাদ দাবি করেন, ছবি না রাখলে ইতিহাস লুকানোর অভিযোগ উঠত। জিন্নাহর নেতিবাচক ভূমিকা সামনে আনতেই ছবির নিচে বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। তাকে কোনোভাবেই দায়মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য ডাকসুর ছিল না।

​বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিবৃতি

​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সমান্তরাল বা দ্বৈত প্রশাসন চলতে পারে না। ডাকসুর প্রতিটি কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের মধ্যে থেকে করতে হবে। স্বাধীনতার ইতিহাসের অবমাননা এবং নিয়ম ভাঙার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৭৩ এর অনুচ্ছেদ ২৪(এ) অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংবিধান ও নীতির অধ্যায় ১৪ এর ধারা ৪ এর নোট অনুযায়ী, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে নেবেন।’

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবনসংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিমে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে যে স্মৃতিস্তম্ভস্থাপন করেছে, তা সিন্ডিকেট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোনো অনুমতি নিয়ে বা আলোচনা করে স্থাপন করেনি। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী এখতিয়ারবর্হিভূত বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্ত কমিটি গঠন

ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের আলোচিত ছবি টানানোর ঘটনা তদন্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন)-কে আহবায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন- আইন অনুষদের ডিন, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন ও প্রক্টর। বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট ম্যানেজার কমিটিতে সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

সারাবাংলা/কেকে/পিটিএম