Monday 21 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ট্রাইব্যুনালে ২২ মামলায় ২৭৫ আসামি, বাড়ছে তদন্তের পরিধি

তাহমিনা ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:৪২ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:৪৯

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ফাইল ছবি

ঢাকা: চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে গুম, আটক, নির্যাতন, হত্যা ও কথিত বন্দুকযুদ্ধসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক ধারায় এগোচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন অভিযোগের তদন্তও চলছে।

চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই বেঞ্চে ২২টি মামলার বিচার চলছে। এসব মামলায় মোট আসামি ২৭৫ জন। তাদের মধ্যে ২০৪ জন পলাতক আর গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন ৭১ জন। অর্থাৎ বিচারাধীন মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামিই এখনো আদালতের আওতায় আসেননি।

বিজ্ঞাপন

এর বাইরে একই সময়ে আরও ৪৪টি মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলায় আসামি ১৪৪ জন। ফলে বিচার ও তদন্ত দুই পর্যায় মিলিয়ে ট্রাইব্যুনালের সামনে থাকা মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আরও বড় পরিসরে।

রায়ের অপেক্ষায় একটি মামলা

বিচারাধীন ২২ মামলার মধ্যে একটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার আসামি।

অন্য তিন আসামি হলেন- কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান।

গত ১০ জুন প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। চার আসামিই পলাতক রয়েছেন।

এর আগে, ১৫ সেপ্টেম্বর ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়। ওই মামলায় সাতজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায় হয়েছে এবং এসব মামলায় মোট ৬৮ জনের সাজা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচারাধীন মামলায় কোন ধরনের অভিযোগ

ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে এখন শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাই নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে।

বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে গুম, আটক, নির্যাতন, হত্যা, কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ এবং জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নামে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাও চলছে।

তথ্যানুযায়ী, তদন্তাধীন ও বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে গুমসংক্রান্ত ১১টি, কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের দুটি, জঙ্গি দমনের নামে হত্যাকাণ্ডের একটি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে ৩০টি মামলা রয়েছে। তদন্তাধীন ৪৪ মামলার কাঠামোতে ট্রাইব্যুনাল-১ এর অধীনে ৩৪টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এর অধীনে ১০টি মামলা রয়েছে বলে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছয় মামলার বিচার

বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রয়েছে ছয়টি মামলা। এর মধ্যে দুটি মামলায় র‌্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল এবং ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) এ গুম, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

এ ছাড়া ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ড, ২০১৬ সালের কল্যাণপুরের কথিত ‘জাহাজ বাড়ি’ অভিযান, একই বছরের গাজীপুরের জয়দেবপুরে কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযান এবং ২০১৮ সালে টেকনাফে সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হকের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলাও বিচারাধীন রয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলার তদন্ত চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর একটি টিএফআই সেলে গুম, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত এবং অন্যটি ২০১৪ সালে মেহেরপুরের জামায়াত নেতা তারেক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অভিযোগ নিয়ে।

গুমের মামলায় বিশেষ গুরুত্ব

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, গুমের মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। শিগগিরই ১১টি গুমসংক্রান্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া আড়াই শতাধিক ব্যক্তির অভিযোগ নিয়ে আরও একটি মামলা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ওই অভিযোগগুলোর মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনাও রয়েছে বলে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে।

তদন্তের পরিধি আরও বাড়ছে

বিচারাধীন মামলার পাশাপাশি ৪৪টি মামলার তদন্ত চলায় ট্রাইব্যুনালের সামনে নতুন মামলার চাপও বাড়ছে। এসব মামলায় ১৪৪ জন আসামির নাম রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্ত সংস্থায় ২৩ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন এবং প্রসিকিউশন টিমেও জনবল বাড়ানো হয়েছে। সীমিত জনবল ও লজিস্টিক সহায়তার মধ্যেই তদন্ত ও বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ, বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের দুটি বড় ধারা—একদিকে পুরোনো অভিযোগের বিচার, অন্যদিকে নতুন অভিযোগের তদন্ত একসঙ্গে এগোচ্ছে। ফলে সামনে আরও একাধিক মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, চার্জ গঠন ও বিচার শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

পলাতক আসামিই বড় চ্যালেঞ্জ

বিচারাধীন ২২ মামলায় ২৭৫ আসামির মধ্যে ২০৪ জনের পলাতক থাকা বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। অর্থাৎ মোট আসামির প্রায় ৭৪ শতাংশ এখনো গ্রেফতার হননি।

তবে পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতেও আইন অনুযায়ী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এমন মামলায় ট্রাইব্যুনাল পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া চালানোর ব্যবস্থা করছে। চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলাতেও ১৭ পলাতক আসামির জন্য স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল।

সাত রায়ের পর নতুন পর্যায়

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া ইতোমধ্যে কয়েকটি রায়ে পৌঁছেছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে আরও কয়েকটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায়ও ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হয়েছে। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার এখন শুধু তদন্ত বা অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই একাধিক মামলা রায় ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার পর্যায়েও প্রবেশ করেছে।

বর্তমান চিত্র বলছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে এখন একই সঙ্গে তিন ধরনের কার্যক্রম চলছে রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলা, চলমান বিচার এবং নতুন মামলার তদন্ত।

একদিকে ২২ মামলার ২৭৫ আসামির বিচার চলছে, অন্যদিকে ১৪৪ আসামিকে নিয়ে আরও ৪৪টি মামলার তদন্ত চলছে। এর সঙ্গে আড়াই শতাধিক নিখোঁজ ব্যক্তির অভিযোগ নিয়ে নতুন মামলার প্রস্তুতি এবং গুমসংক্রান্ত ১১ মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ রয়েছে।

ফলে আগামী দিনগুলোতে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহিংসতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, আটক, নির্যাতন ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের অভিযোগের বিচারও বড় অংশজুড়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর