রাজশাহী: শারীরিক সীমাবদ্ধতা অনেকের পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ালেও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও দায়িত্ববোধ থাকলে সেই বাধা যে জয় করা সম্ভব। তারই জ্বলন্ত উদাহরণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। এক হাতের প্রতিবন্ধকতা নিয়েও থেমে নেই তার পথচলা। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা, ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত সক্রিয় থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।
আব্দুল্লাহ আল মাসুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। রাকসু নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ থেকে পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে ছয় হাজার ১৬৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন মাসুদ। ক্যাম্পাসের পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, মাদকবিরোধী অভিযান এবং পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগে তাকে সরব থাকতে দেখা যায়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে নিজের দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হিসেবে না দেখে বরং শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার প্রেরণা হিসেবে নিয়েছেন তিনি।
এসব বিষয় নিয়ে সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় আব্দুল্লাহ আল মাসুদের। তিনি বলেন, ‘শারীরিক সীমাবদ্ধতা আমার জন্য একটি বাস্তবতা। এটাকে আমি শিক্ষার্থীদের কাজে বাধা হতে দিইনি। আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটি আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতে চাই। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করাই আমার মূল লক্ষ্য।’
সহপাঠী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় না এনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন মাসুদ। শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি সমাধানের জন্যও কাজ করেন তিনি। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবেশগত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেগুলো নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
মাসুদের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো- ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত ড্রেন ও নর্দমাগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ক্যাম্পাসে অবস্থিত দোকানগুলোর খাবার মনিটরিং, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, দফায় দফায় মাদকবিরোধী অভিযান, ক্যাম্পাসে অপ্রয়োজনীয় ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণ, অতিথি পাখিদের নিবিড় পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, খাবারের মূল্য তালিকা সংযোজন, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ও ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধন কর্মসূচি। এ ছাড়াও, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় সভা ও স্মারকলিপিও দিয়েছেন তিনি।
মাসুদ বলেন, ‘২৮ হাজার শিক্ষার্থীর হাতই আমার হাত। তাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও কৃতজ্ঞতাই আমাকে কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। এর আগে একটি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জড মানুষদের নিয়েও কাজ করেছি। আর রাকসুর দায়িত্বকে আমি শিক্ষার্থীদের দেওয়া একটি আমানত মনে করি। সেই আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করার অনুপ্রেরণাই আমাকে সবসময় কাজ করতে উৎসাহিত করে।’
মাসুদকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘অন্যান্য সম্পাদকের কাজের চাইতে মাসুদ ভাইয়ের কাজগুলো আমাদের আকর্ষিত করেছে। এক হাতে কাজ করতে না পারা সত্ত্বেও আমাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমুলক কাজ, বিশেষ করে খাবার মনিটরিং, মাদকবিরোধী অভিযান এ কাজগুলো সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’
মাসুদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি শুধু তার শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করার নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্বের প্রতি তার আন্তরিকতার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলাদা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
মাসুদ আরও বলেন, ‘আমি এখানে আসছি মূলত শিক্ষার্থীদের সেবা করার জন্য। এটাকে আমি আমার দায়িত্ব হিসেবে মনে করি এবং সেই দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করছি। দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারতাম। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্বের কারণে পড়াশোনার সময় অনেক কমে গেছে। মাস্টার্সের পড়াশোনার জন্য প্রতিদিন পাঁচ-ছয় ঘণ্টা, এমনকি সাত-আট ঘণ্টা সময় দেওয়া প্রয়োজন। এখন দিনে হয়তো এক ঘণ্টার মতো পড়তে পারি। তারপরও শিক্ষার্থীদের জন্য সময় দেওয়াকে আমি এক ধরনের ত্যাগ হিসেবে দেখি।’
কাজ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া কোনো স্মরণীয় অভিজ্ঞতা আছে কি না?—এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে মাদকসংক্রান্ত বিষয়টি। রাকসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে রাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখেছি, প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে এত কম বয়সী শিক্ষার্থীদের মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি আগে এভাবে উপলব্ধি করিনি। কাছ থেকে বিষয়টি দেখার পর সত্যিই খুব খারাপ লেগেছে এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার তাগিদ অনুভব করেছি।’
মাসুদকে নিয়ে রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাসুদ শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনো তার দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হতে দেয়নি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, ক্যাম্পাসের পরিবেশ, খাবারের মান ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে সে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তার কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার গল্প।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান মাসুদ সম্পর্কে সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাসুদ ছেলেটির সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আমরা জানি, তার একটি হাত নেই। তবুও সে অত্যন্ত দায়িত্ববান। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে পেছনে রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, সেটি সত্যিই প্রশংসনীয়।’