ঢাকা: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইমকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্কের শুনানি পিছিয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৫ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রোববার (২৫ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সময়ের আবেদন করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, এদিন মামলায় দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কথা ছিল। তবে জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য সময় প্রয়োজন। পরে আদালত ৫ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিনের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেওয়া তাইমকে ধরে নিয়ে হত্যার ঘটনার বিবরণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের গুলি চালানোর ভিডিও ও স্থিরচিত্র উপস্থাপন করে।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। ওই সময় পুলিশের সাঁজোয়া যান থেকে ব্যাপক গুলি চালানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ করে রাষ্ট্রপক্ষ।
পরিস্থিতির মধ্যে বন্ধুদের নিয়ে যাত্রাবাড়ীর পূর্বদিকে কাজলা এলাকার একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেন তাইম। কিছুক্ষণ পর দোকানটির সামনে ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ সদস্য জড়ো হন। তাঁদের দেখে তাইম ও তাঁর বন্ধুরা দোকানের শাটার নামিয়ে দেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, কয়েকজন পুলিশ সদস্য শাটার খুলতে বললেও তা খোলা হয়নি। এ সময় পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ তাদের ‘ক্রসফায়ার’ করার কথা বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে শাটার খুলে তাইমকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁর বাঁ পায়ে ও কোমরের কাছে গুলি করা হয় বলে রাষ্ট্রপক্ষের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দোকান থেকে বিভিন্ন মালামাল লুটের অভিযোগও আনা হয়েছে। লুট হওয়া মালামালের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার টাকার সিগারেট ছিল বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
প্রথম দিনের যুক্তিতর্কে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-এর সঙ্গে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার ইকবাল হোসাইন-এর কথোপকথনের একটি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ভিডিওতে ইকবাল হোসাইন-কে বলতে শোনা যায়, ‘একটা গুলি করি, একটাই যায়, বাকিডি যায় না, স্যার।’ এ ছাড়া তাইমকে গুলি করার ভিডিও এবং মামলার আরেক আসামি সাজ্জাদ উজ জামানের স্থিরচিত্রও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরা হয়।
এ মামলার ১১ আসামির মধ্যে বর্তমানে দুজন গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান ও সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শাহাদাত আলী।
অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার ইকবাল হোসাইন, অতিরিক্ত উপকমিশনার শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন এবং উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান। তারা পলাতক রয়েছেন বলে মামলার তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ১১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর ২৯ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। গত ১৫ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর-এর জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয় এবং পরদিন ১৬ জুন ২৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। পরে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে মামলাটি যুক্তিতর্কের পর্যায়ে আসে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তাইমকে হত্যা করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাঁর বন্ধু রাহাতকেও গুলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেওয়া, উসকানি ও প্ররোচনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
নিহত তাইমের বাবা মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া পুলিশের একজন উপপরিদর্শক (এসআই)। তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে কর্মরত। আগামী ৫ নভেম্বর মামলাটিতে দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।