Saturday 09 May 2026
সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net

হতাশ রংপুরের চাষিরা
রেকর্ড আলু উৎপাদন হলেও রফতানি মাত্র ৪ শতাংশ

রাব্বী হাসান সবুজ
৮ মে ২০২৬ ০৮:১৬

রংপুর: দেশের আলুর রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে রংপুর। তবে, উৎপাদনে রেকর্ড গড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি হচ্ছে মোট উৎপাদনের মাত্র ৪ শতাংশের মতো আলু। ফলে উৎপাদন বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উত্তরবঙ্গের কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মতে, গত কয়েক বছর ধরে দেশের আলু উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে রংপুর। ২০২৪-২৫ মৌসুমে রংপুর বিভাগে ৩২ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। যা দেশের মোট আলুর ১৫ থেকে ২৪ শতাংশ। কিন্তু এই বিপুল উৎপাদন আশাব্যঞ্জক হলেও বিদেশে রফতানি হচ্ছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ আলু। এতে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

যে কারণে আটকে রফতানি

বিজ্ঞাপন

কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে ‘গ্যাপ’ (উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা) পদ্ধতিতে আলু উৎপাদন জরুরি। কিন্তু রংপুরে এখনো রফতানিযোগ্য আলুর জন্য নির্দিষ্ট চাষি জোন গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে রংপুরে উৎপাদিত প্রায় ৯০ শতাংশ আলুই সাধারণ খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। রফতানিযোগ্য বিশেষ জাতের আলু চাষে কৃষকদের পর্যাপ্ত সহায়তা ও প্রণোদনা নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা না থাকায় কৃষকরাও উৎসাহিত হচ্ছেন না।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪২১টি হিমাগার আছে, যার সক্ষমতা প্রায় ২১ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু এই সক্ষমতা আমাদের বাৎসরিক আলু উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম। আলু উৎপাদন বাড়ছে ৮-১০ শতাংশ হারে, কিন্তু হিমাগার বাড়ছে মাত্র ২-৩ শতাংশ হারে। এ ব্যবধান পূরণ না হলে আলু রফতানি স্বপ্নই থেকে যাবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে বর্তমানে ৪২টি হিমাগার রয়েছে, যেখানে সংরক্ষণ করা যায় প্রায় ৪ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন আলু। মোট উৎপাদনের মাত্র ৩০ শতাংশ আলু এই হিমাগারে জায়গা পায়। অথচ উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের সুযোগ পান না কৃষকরা। ফলে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।

হিমাগার ব্যবসায়ীরা বলছেন, আলু সংরক্ষণ খরচ অনেকটাই বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৬ টাকা, অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ টাকা দরে। এতে কেজিপ্রতি ১৩-১৪ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার সংকট

কৃষি গবেষক ড. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ইউরোপের বাজারে লম্বাটে ও কম জলীয় অংশযুক্ত আলুর চাহিদা বেশি। কিন্তু রংপুরে মূলত কার্ডিনাল ও ডায়মন্ডের মতো গোলাকৃতি জাতের আলু উৎপাদিত হয়। এগুলো চিপস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তৈরির জন্য উপযোগী নয়। এ কারণেও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে বাধা তৈরি হচ্ছে।

রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দের কৃষক আবদুল কাদের বলেন, ‘আলু রফতানির কথা শুনি, কিন্তু কেউ কখনো এসে বলেনি কীভাবে রফতানিযোগ্য আলু চাষ করতে হবে।’

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় আলু রফতানি করেছেন পীরগাছার কৃষক হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিদেশি ক্রেতারা ১০০ গ্রামের ওপরের ওজনের আলু কিনে থাকে। মাঝারি সাইজের আলু ১৪ টাকা কেজি বিক্রি করলেও ছোট আলু স্থানীয় বাজারে মাত্র ৫ টাকায় বিক্রি করতে হয়। এতে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েন।’

কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশের আলু?

বর্তমানে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তানে- সানশাইন, এন্টারিক্স, গ্রানোলা, ডায়মন্ড ও কুম্ভিকা জাতের আলু রফতানি হচ্ছে। সম্প্রতি পঞ্চগড়ের স্থলবন্দর দিয়ে ৯৬৬ মেট্রিক টন আলু নেপালে রফতানি হয়েছে। এছাড়া নতুন বাজার হিসেবে ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

এদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন আলু রফতানি হয়েছে। তবে, পরের বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫৩ মেট্রিক টনে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এরইমধ্যে ১২৬ মেট্রিক টন আলু রফতানি হয়েছে। আর রফতানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০-৬০ হাজার টনে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

নতুন সম্ভাবনা

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহায়তায় রংপুরে ‘গ্যাপ’ পদ্ধতিতে আলু চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে ৬০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং বিশেষ মানের ১৫ মেট্রিক টন আলু সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রফতানি করা হয়েছে।

তবে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ার জটিলতা রয়েছে। জানা গেছে, সম্প্রতি ভারতের পেপসিকো ইন্ডিয়া হোল্ডিংস থেকে ৩৭০ টন আলু আমদানি করলেও তা যথাযথ কাগজপত্র না থাকায় বেনাপোল বন্দরে আটকে আছে। এতে কৃষকরা শঙ্কার রয়েছেন।

রংপুর জেলার কৃষি বিপণন অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা শাকিল আখতার বলেন, ‘জেলায় একটি সরকারিসহ ৪২টি আলুর হিমাগার আছে। এসব হিমাগারে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন আলু রাখার সুযোগ আছে। এছাড়া কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে ১২১টি অহিমায়িত আলুর মডেল ঘর করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩০ শতাংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা যাবে।’

বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানে আলু চাষে উৎপাদন খরচ বাংলাদেশি টাকায় ১০ টাকা। অথচ উত্তরবঙ্গে আলুর উৎপাদন খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ টাকা। উৎপাদন খরচ ১০ টাকায় কমিয়ে না আনলে আলু রফতানি হবে না।’

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর