Wednesday 06 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রাজনীতি নিষিদ্ধ বেরোবিতে সবকিছুই রাজনীতি কেন্দ্রিক!

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৬ মে ২০২৬ ০৮:১১ | আপডেট: ৬ মে ২০২৬ ০৮:২২

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে (বেরোবি) বছর দেড়েক আগে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও ক্যাম্পাসের মাঠে ও প্রশাসনিক ভবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানসহ চলছে জোরেশোরে দলীয় রাজনীতি। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নিয়মিত আয়োজন করেছে ইফতার মাহফিল, সম্প্রতি করেছে প্রকাশনা উৎসবের মতো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানও। আর এসব আয়োজনে উপাচার্যসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সরাসরি অংশও নিচ্ছেন, যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি এক আয়োজনে বাগ্বিতণ্ডারও সূচনা হয়।

আবু সাঈদ হত্যার পর নিষেধাজ্ঞা, বাস্তবে উল্টো চিত্র

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাঈদ ও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা নতুন বাস্তবতায় ক্যাম্পাসে অরাজকতা ও দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় বিস্তারিত আলোচনা শেষে ক্যাম্পাসে সবধরনের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । একইসঙ্গে সিন্ডিকেট সভায় আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই শিক্ষক ও সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ৭২ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়।

সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো দলের সদস্য হওয়া বা দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার দেড় বছর পেরোতে না পেরোতেই ক্যাম্পাসের চিত্র পালটে গেছে।

উপাচার্যের উপস্থিতিতে ছাত্রদলের ইফতার ও ফোরামের আসর

সাম্প্রতিক বেরোবি ক্যাম্পাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো গত ৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমানের সভাপতিত্বে ‘জাতীয়তাবাদী ফোরাম’র নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন। ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী। এমনকি অনুষ্ঠানে ছাত্রদল, বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ব্যাপক উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনের তীব্র প্রতিবাদ জানালে বাগ্বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।

এর আগে গত ৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারক মাঠে বেরোবি শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেখানেও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন উপাচার্য। শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে আয়োজিত গণ‌-ইফতার মাহফিলে পরিবহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের মাইক্রোবাস ও মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারও করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতার অভিযোগ উঠে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে প্রশাসন।

এ বিষয়ে বেরোবি ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিনের দাবি, ‘অতীতে ছাত্রলীগের বাধার কারণে সুষ্ঠু রাজনীতি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু এক সংগঠনের অপকর্মের দায়ে পুরো ক্যাম্পাসের রাজনীতি বন্ধ রাখা যায় না।’

ছাত্রশিবিরের দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান ও প্রশাসনের ভূমিকা

ছাত্রদলের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সক্রিয় রয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। গত শনিবার থেকে তারা স্বাধীনতা স্মারক মাঠে দুই দিনব্যাপী ‘নববর্ষ প্রকাশনা উৎসব’ আয়োজন করে। রোববার রাত পর্যন্ত চলে এ উৎসব। এই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা রায়হান সিরাজীসহ জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। এ ছাড়া নানা ব্যানারে ইফতার মাহফিল ও নবীনবরণের আয়োজন করছে সংগঠনটি। ছাত্রশিবির সভাপতি মো. সুমন সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে রায় দেবে, আমরা তা মাথা পেতে নেব।’

এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখনো রাজনীতি বন্ধ রয়েছে। ছাত্রদল যা করেছে তা ঠিক হয়নি।’

অন্যদিকে উপাচার্য শওকাত আলী সারাবাংবেলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছাত্রদলকে দলীয় ব্যানার ব্যবহার করতে নিষেধ করেছি এবং ছাত্রশিবিরের ওই আয়োজনে বাধা দিয়েছি।’ তবে অরাজনৈতিক শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, ‘এসব বাধা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

শহিদ আবু সাঈদের সহপাঠীরা যা বলছেন

শহিদ আবু সাঈদের সহপাঠী ও বেরোবির শিক্ষার্থী রিশাদ নুর সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমানে কিছু নব্য রাজনীতিক ক্যাম্পাসে পুরোনো বন্দোবস্ত ফিরিয়ে আনতে চান। তাদের কাছে ক্ষমতা ও টাকার লোভ কাজ করছে। তারা বেরোবির ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর চাওয়া উপেক্ষা করে রাজনীতি ফেরানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।’

এদিকে, ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির নামে সক্রিয়তা বাড়ায় ভবিষ্যতে আবারও অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা। তারা প্রশাসনের কাছে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর