Saturday 25 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিপর্যয়: ১১ কেন্দ্রের ৭টিই বন্ধ, বাড়ছে লোডশেডিং

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:৫০ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৪৩

রংপুর: তীব্র দাবদাহে যখন উত্তরের জনজীবন বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। রংপুর বিভাগের ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সাতটিই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অচল এই কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট। চালু থাকা কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও নেমে এসেছে ২০-৩০ শতাংশে। ফলে বাড়তে থাকা লোডশেডিং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, রংপুর বিভাগের আট জেলায় (রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) বর্তমান দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদা সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট। অথচ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৭২০ মেগাওয়াট। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে ঘাটতি ছিল প্রায় দেড়শ মেগাওয়াট। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবকিছুতে স্থবিরতা এনেছে।

বিজ্ঞাপন

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, জ্বালানি সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি ও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের সংকট বৈশ্বিক হলেও এর প্রভাব প্রকটভাবে পড়েছে এই অঞ্চলের বিদ্যুৎ খাতে।

জানা গেছে, ৫২৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার দিনাজপুর বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটই বন্ধ। সর্বশেষ সক্রিয় ইউনিটটি (১২৫ মেগাওয়াট) গত ২২ এপ্রিল কয়লার সঙ্গে পাথর এসে বয়লারের টিউব ফেটে বন্ধ হয়ে যায়। আরও দুটি ইউনিট—দ্বিতীয় (১২৫ মেগাওয়াট) ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে এবং তৃতীয় (২৭৫ মেগাওয়াট) ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এই কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র কার্যত অচল।

এছাড়া ১৬০ মেগাওয়াটের পিডিবি পার্বতীপুর, নীলফামারির সৈয়দপুরের ১৫০ ও ২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি কেন্দ্রই বন্ধ। অন্যদিকে রংপুর সিটির ২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি বন্ধ; কনভিডেন্স পাওয়ারের ১১৩ মেগাওয়াট কেন্দ্র উৎপাদন করছে সক্ষমতার মাত্র ২০ শতাংশ (২০-২৫ মেগাওয়াট)। ঠাকুরগাঁওয়ের ১১৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রটি উৎপাদন করছে ৪০ শতাংশের কম (জ্বালানিসংকটের কারণে)।

সূত্র জানায়, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ইয়ার্ডে কয়লা মজুত রয়েছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘একদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি, অন্যদিকে কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ করার কেন্দ্র বন্ধ থাকায় খনির কয়লা অব্যবহৃত থেকে সম্পদের অপচয় বাড়ছে। এটি উত্তরাঞ্চলের জন্য নীরব বিদ্যুৎ বিপর্যয়।’

তিনি আরও বলেন, অস্থায়ী মেরামত নয়, বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত জরুরি। অন্যথায় কৃষি, শিল্প ও সাধারণ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হবে।

যদিও কর্তৃপক্ষ মেরামতের আশ্বাস দিচ্ছে, বলছেন, সময়সীমা নিয়ে সংশয় আছে। এবিষয়ে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘গত ২২ এপ্রিল বন্ধ হয়ে যাওয়া ১ নম্বর ইউনিট (১২৫ মেগাওয়াট) মেরামতের কাজ শেষে ৪-৫ দিনের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে। তবে ২৭৫ মেগাওয়াটের ৩ নম্বর ইউনিট চালু হতে আগামী মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’

অন্যদিকে, গত ৩০ ডিসেম্বর বন্ধ হয়ে ১৪ জানুয়ারি চালু হওয়া প্রথম ইউনিট আবার বন্ধ হয়েছে, যা মেরামতের পদ্ধতি ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতজনিত কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে জ্বালানিসংকট প্রকট হয়ে ওঠে। ডলার সংকটের সময় এলসি খোলায় জটিলতা আরও পরিস্থিতি জটিল করেছে।

জ্বালানি খাতের গবেষক রায়ান আহমেদ রাজু মনে করছেন, বড়পুকুরিয়ার মতো কেন্দ্রগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কয়লার গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সেই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন আছে।

এদিকে বিদ্যুৎ বিপর্যয় জনজীবনে প্রভাব ফেলছে কঠিনভাবে। উত্তরাঞ্চলের হাসপাতাল, কোল্ড স্টোরেজ, সেচপাম্প ও ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা বিদ্যুৎ না পেয়ে বিপাকে পড়েছে। রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকার থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনা ও অস্বস্তি।

এ বিষয়ে নেসকো রংপুর বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, বরাদ্দ কম পাওয়ায় লোডশেডিং এড়ানোর উপায় নেই। তবে পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বড়পুকুরিয়ার মতো মূল স্তম্ভটি অচল থাকায়, উত্তরাঞ্চলের লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা।

গবেষক রায়ান আহমেদ রাজু বলেন, সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, মে মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে কেন্দ্রগুলো চালু হবে। কিন্তু সেসব কেন্দ্রের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উত্তরের জনগণকে দহনজ্বালা সহ্য করেই যেতে হবে। সঙ্গে বাড়ছে সম্পদের অপচয়ের ক্ষত।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর