Saturday 06 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

লক্ষ্য ৩০ হাজার মেট্রিক টন / এবার হাঁড়িভাঙ্গা আম ভাঙবে উৎপাদনের হাঁড়ি!

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৬ জুন ২০২৬ ০৯:২১

হাঁড়িভাঙ্গা আম। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

রংপুর: দেশের ঐতিহ্যবাহী ভৌগলিক নির্দেশক বা জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসা শুরু হবে। দেশে উৎপাদিত একমাত্র আঁশবিহীন সুস্বাদু এই ফলটি এরই মধ্যে দেশসেরা আম হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও এবার বৈশাখের দুর্যোগে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। তবে আশার কথা হচ্ছে, এবারও আম পুষ্ট হওয়ার আগেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে ২৫ কোটি টাকার রফতানি অর্ডার পেয়েছেন বাগান মালিকরা।

২৫ কোটি টাকার রফতানি অর্ডার, লক্ষ্য ৫০ কোটি টাকা

হাঁড়িভাঙ্গা আমের সবচেয়ে বড় বাগান মালিকদের একজন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জের রমজান আলী। সারাবাংলাকে তিনি জানান, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের আড়তদাররা এবার অগ্রিম টাকা দিয়ে বাগান বুকিং করছেন। তার মতো অন্তত ৪০টি বাগানের মালিকদের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। আপাতত ২০ কোটি টাকার আমের অর্ডার মিললেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাহিদা বেশি থাকায় এবার রফতানি ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

বিজ্ঞাপন

বৈরী আবহাওয়ায় ফলনের শঙ্কা

তবে বৈশাখ মাসজুড়ে অবিরাম বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন আমচাষিরা। তারা বলছেন, এবারের বৈরী আবহাওয়া, শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ের ফলে অনেক আম ঝরে গেছে এবং গাছের ক্ষতিও হয়েছে। কিন্তু রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহকারী উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘কিছুটা ক্ষতি হলেও তা অস্বাভাবিক নয় এবং উৎপাদনে তত বড় প্রভাব পড়বে না।’

চাষাবাদের বিস্তার ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ২০০ হেক্টর বেশি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পরেও বাগান মালিক ও চাষিরা ৩০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করছেন, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘মিঠাপুকুর উপজেলায় ১ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ৭৫টি হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাগান রয়েছে। গতবছর এ উপজেলায় ৯০ থেকে ১০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হলেও এ বছর লক্ষ্য ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা।’

২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিক বিপণন

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, হাঁড়িভাঙ্গা আম পুরোপুরি পুষ্ট হতে দেশের অন্যান্য আমের চেয়ে বেশি সময় লাগে। তাই ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিপণনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ ১৫ জুন থেকে আম পাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। অতিরিক্ত গরমে এবার কিছু বাগানে নির্ধারিত সময়ের আগেই পাকা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে চাষিরা।

রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরাসরি বাগান থেকে আম কেনার সুবিধার্থে পাইকারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। টাকা লেনদেনে ব্যাংকের বুথ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হবে। এ ছাড়া জনপ্রিয় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো পদাগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অফিস স্থাপন করেছে এবং বাগান থেকে সরাসরি গ্রাহকের কাছে আম পৌঁছে দিতে বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা রেখেছে।’

কৃষি কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বিপণন বিভাগের উপ-পরিচালক সিফাত জাহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙ্গা আম রংপুরের ঐতিহ্যকে দেশে-বিদেশে পরিচিত করেছে। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩০ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে এবং চাহিদা বৃদ্ধিতে চাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা করা যায়।’

হাঁড়িভাঙ্গার ইতিহাস ও প্রসার

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, হাঁড়িভাঙা আম গাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ডালপালা ঊর্ধ্বমুখী বা আকাশচুম্বী হওয়ার চেয়ে পাশে বেশি বিস্তৃত হতে দেখা যায়। ফলে উচ্চতা কম হওয়ায় ঝড়-বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ে না, আমও কম ঝরে পড়ে। মাঘ-ফাল্গুন মাসে এই আমের গাছে মুকুল আসে। পাকতে শুরু করে আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহ থেকেই।

আমটির উপরিভাগ বেশি মোটা ও চওড়া, নিচের অংশ অপেক্ষাকৃত চিকন। আমটি দেখতে সুঠাম ও মাংসালো, শ্বাস গোলাকার ও একটু লম্বা। আমের তুলনায় শ্বাস অনেক ছোট, ভেতরে আঁশ নেই। হাঁড়িভাঙা আম আকারের তুলনায় অন্য আমের চেয়ে ওজনে বেশি, গড়ে তিনটি আমে এক কেজি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি আম ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের হয়ে থাকে। পুষ্ট আম বেশিদিন অটুট থাকে। চামড়া কুচকে গেলেও পচে না। ছোট থেকে পাকা পর্যন্ত একেক স্তরে এই আমের স্বাদ একেক রকম। তবে আমটি খুব বেশি না পাকানোই ভালো বলে পরামর্শ কৃষি বিভাগের।

হাঁড়িভাঙা আমের বিশেষত্ব অনেক। আঁশবিহীন, মাংসল, মিষ্টি, ছোট বিচি আর পাতলা খোসা–স্বাদে অতুলনীয়। এটি এখন রংপুরের জিআই (ভৌগোলিক সূচক) স্বীকৃত পণ্য। এই স্বীকৃতির কারণে দেশে-বিদেশে চাহিদা অনেক বেড়েছে। গত মৌসুমে জার্মানিতে প্রথমবারের মতো ২০০ কেজি রফতানি হয়েছে, আরও অর্ডার আসছে। মিঠাপুকুর থেকে শুরু হয়ে এখন রংপুরের সব উপজেলা ছাড়াও দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওসহ আশপাশের জেলায় চাষ ছড়িয়েছে।

বুড়িরহাট হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক ডা. আবু সায়েম সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা আম শত শত পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে হাঁড়িভাঙা ছাড়াও মোহনভোগ, বারি-৪, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, খিরসাপাতি, চ্যাঁতাপুরি, লখনা, গৌরমতি, আম্রপালি, নাকফজলি প্রভৃতি জাতের আম চাষ হয়। তবে হাঁড়িভাঙাই সবচেয়ে জনপ্রিয়।’

স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় হাঁড়িভাঙা আম গত এক দশক ধরেই রংপুরকে ব্র্যান্ডিং করে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে এই পণ্যটি ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য তথা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। সেই স্বীকৃতির পর তৃতীয়বারের মতো চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙা আম বাজারে আসছে আর কিছুদিন পরেই।

এদিকে জাতীয়ভাবে পরিচিতি পাওয়ার পর এখন দেশের বাইরে হাঁড়িভাঙা আম রফতানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই আমটি মূলত উত্তরের জেলা রংপুরে আবাদ হয়। রংপুরের মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের পদাগঞ্জ এলাকায় এ আমের বাগান বেশি। বিশেষ করে এই পদাগঞ্জ এলাকার একসময়ের অনাবাদি জমিতে এখন গড়ে উঠেছে আমের বাগান।

স্থানীয়রা বলছেন, পদাগঞ্জ থেকে শুরু করে রংপুরের বিভিন্ন স্থানে হাঁড়িভাঙা আমের ফলন হচ্ছে প্রায় ৩০ বছর ধরে। কিন্তু এই আমের তেমন একটা পরিচিতি ছিল না। ২০১৫ সালে ঢাকায় ফল মেলা হলে সেখানে এই আম পরিচিতি পায়। এর অনন্য স্বাদ ও গন্ধ মানুষকে আকৃষ্ট করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে রংপুরের আম হিসেবে একনামে সারা দেশে পরিচিত হয় হাঁড়িভাঙা আম। সারাদেশেই তৈরি হয় এর কদর।

হাঁড়িভাঙা আমের গোড়াপত্তন করেছিলেন খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের নফল উদ্দিন পাইকার নামে এক ব্যক্তি। নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে আমজাদ হোসেন সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে জানান, ১৯৪৯ সাল, তখন তার বাবা নফল উদ্দিন একটি গাছটি রোপণ করেছিলেন। একটি জমি থেকে দু’টি আমের চারা নিয়ে এসে কলম করেন তার বাবা। তবে একটি গাছ চুরি হয়ে যায়। বাকি গাছটিতে মাটির হাঁড়ি বেঁধে পানি (ফিল্টার সিস্টেমে) দেওয়া হতো। একদিন রাতে কে বা কারা মাটির হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে। সেদিন থেকেই গাছটির নাম হাঁড়িভাঙা আম গাছ।

তিনি আরও জানান, গাছটিতে এক সময় বিপুল পরিমাণ আম ধরে। খেতে খুবই সুস্বাদু। বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে গেলে লোকজন এই আম সম্পর্কে জানতে চায়। তখন থেকেই গাছটি হাঁড়িভাঙা নামে পরিচিতি পায়। এখন হাঁড়িভাঙা আমের সুনাম মানুষের মুখে মুখে। গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বাগান। তিনি হাঁড়িভাঙা আমের মাতৃগাছটির সংরক্ষণের দাবি জানান।

বর্তমানে বদরগঞ্জের গোপালপুর, পদাগঞ্জ, কুতুবপুর, নাগেরহাট সর্দ্দারপাড়া, সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করণীর কাঁটাবাড়ি ও মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাণিজ্যিক বাগান। লালমাটি অঞ্চলে এই আম যেমন ভালো ফলন হয়, তেমনি স্বাদও অনন্য।

বদলে যাওয়া ভাগ্য, বাড়তি দাবি সংরক্ষণের

একসময় অনাহারে থাকা পদাগঞ্জ ও খোড়াগাছ এলাকার মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে হাঁড়িভাঙ্গা আম। লাল মাটির অঞ্চলে বছরে একবার ধান হতো, বাকি ৮ মাস জমি পতিত থাকত। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে আমবাগান। ভূমিহীন পরিবারগুলো বাড়ির আঙিনায় আমগাছ লাগিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

তেকানী গ্রামের কৃষক সহিদার রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে ধান ও আলু চাষ করে বছরে লাভ হতো ৯০-৯৫ হাজার টাকা। আট বছর আগে হাঁড়িভাঙ্গার বাগান করে গতবছর আয় করেছি ৪ লাখ টাকা।’ খোড়াগাছের সিরাজুল ইসলাম সাত একর জমির বাগান থেকে গড়ে আয় করেন ১৪ লাখ টাকা। আসমা খাতুনের মতো নারী উদ্যোক্তাও ঘরের আঙিনায় আমগাছ লাগিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

তথ্য বলছে, জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আমের এবারও রফতানি অর্ডার ২৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বৈশাখের দুর্যোগে ফলন কমার শঙ্কা থাকলেও বাম্পার উৎপাদনের আশা করছেন চাষিরা। ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসছে এই আঁশবিহীন সুস্বাদু আম। লালমাটি অঞ্চলের হাজারো পরিবারের ভাগ্যবদলে যাওয়া এই আমের সংরক্ষণ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের দাবি উঠেছে।

কিন্তু অভিযোগ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় পানির দামে আম বিক্রি করতে হয়। বড় ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে নেয়ায় মাঝারি ও ক্ষুদ্র চাষিরা লাভের বড় অংশ পান না। সংরক্ষণ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর