Friday 29 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সরকারি দাম উপেক্ষা
সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে লোকসানের মুখে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৯ মে ২০২৬ ১৪:৪৭ | আপডেট: ২৯ মে ২০২৬ ১৭:০৯

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে লোকসানের মুখে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: পবিত্র ঈদুল আজহায় রংপুর অঞ্চলে কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচায় সরকার নির্ধারিত দাম উপেক্ষা করে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ‘পানির দামে’ বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এবার প্রতিপিস গরুর চামড়া ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম। অথচ সরকার ঢাকার বাইরে (রংপুর অঞ্চলসহ) প্রতি বর্গফুট লবণ দেওয়া গরুর চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করে রেখেছে। এই হিসেবে একটি মাঝারি গরুর চামড়ার দাম পড়ার কথা ছিল অন্তত ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু, বাস্তবে তা হচ্ছে না।

এর চেয়েও দুর্দশাজনক পরিস্থিতি ছাগলের চামড়ার বাজারে। সরকার সারা দেশে খাসির চামড়ার মূল্য প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করলেও রংপুরের হাট-বাজারে ছাগলের চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায়। এমনকি অনেক আড়তদার ছাগলের চামড়া নিতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

লবণের দাম ও শ্রমিক মজুরি বাড়ায় আড়তদারদের অস্বস্তি

আড়তদাররা বলছেন, বাজারে লবণের দাম অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং শ্রমিকদের মজুরি বাড়ার কারণে সরকারি নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। গতবছর যেখানে লবণের বস্তার দাম ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, সেখানে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। রংপুরের এক চামড়া আড়তদার মকবুল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সংরক্ষণের জন্য লবণ ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতিটি চামড়ায় ৪০০-৫০০ টাকা খরচ পড়ে। তাই সরকারের নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’

তবে ব্যবসায়ীরা এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তাদের অভিযোগ, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে পুরো উত্তরাঞ্চলের চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এই সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে ট্যানারি মালিকরা। রংপুরের চামড়া ব্যবসায়ী মন্টু মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি ৮০০ টাকা দরে চামড়া কিনেছি। পরিবহণ খরচ মিলিয়ে দাম দাঁড়িয়েছে ৮৫০ টাকার ওপরে। কিন্তু আড়তদাররা বলছেন, ৫০০ টাকার বেশি দামে কিনবেন না। এভাবে আমাদের বিশাল লোকসান হচ্ছে।’

জমছে না চামড়ার হাট: ব্যবসায়ীদের দুর্দশার সীমা নেই

শুধু রংপুর শহরেই নয়, শহরের বাইরের উপজেলার চামড়ার হাটেও একই চিত্র দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সাইকেল, রিকশা ও ভ্যানগাড়িতে করে চামড়া নিয়ে হাটে জমায়েত হলেও, পাইকারদের অভাবে চামড়া বিক্রি করতে পারেননি তারা। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার বাজার গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে। সেখানকার চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মাহমুদুল হাসান সারাবাংলাকে জানান, মূল হাট বসবে আগামী বুধবার। ঢাকা থেকে পাইকাররা তখন আসবেন। কিন্তু সে পর্যন্ত চামড়া সংরক্ষণ করে রাখতে গেলে বাড়তি লবণ খরচ ও পচনের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার লালদীঘি গ্রামের রবিন মিয়া ৫০ হাজার টাকার চামড়া কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ি আড়তে। পাইকাররা কোনো দাম না করায় বাড়ি ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ‘ধারদেনা করে চামড়া কিনেছি। লবণ দিয়ে চামড়া রেখেছি। পরে বিক্রি করেও লাভ করতে পারব কিনা চিন্তায় আছি।’

লাম্পি স্কিন ও পচন ঝুঁকি বাড়িয়েছে দুশ্চিন্তা

এবার রংপুর অঞ্চলে লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া পাওয়া যাচ্ছে, যা দেখে স্থানীয় পাইকারেরা চামড়া কিনতে ভয় পাচ্ছেন। এ ছাড়া গরমের কারণে চামড়া দ্রুত পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে দেখা গেছে, শতকরা ১০০ ভাগ ব্যক্তিগত কোরবানি ও ৮৩ ভাগ মৌসুমি ব্যবসায়ী সম্পূর্ণ লবণ ছাড়া অবস্থায় চামড়া বিক্রি করেছেন, যা পচনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চামড়া ভালো রাখতে গেলে কোরবানির পরপরই লবণ মাখানো জরুরি। কিন্তু, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না।

হুমকির মুখে মৌসুমি চামড়া শিল্প

রংপুরের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা সাধারণত ঈদের আগে ‘দাদন’ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে চামড়া কিনে থাকেন। এসব টাকা পরে চামড়া বিক্রি করে শোধ করার কথা থাকলেও, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেকেই লোকসানের মুখে পড়ছেন। রংপুর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক মো. সালাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘একটি সিন্ডিকেট তাদের মনোপলি দিয়ে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছে। সরকারের নির্ধারিত দাম কার্যকর করা যাচ্ছে না। এর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। চামড়া বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধানে সাভার ট্যানারি এস্টেটের সিইটিপির সক্ষমতা বাড়ানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং চামড়া শিল্পের আধুনিকায়ন জরুরি। তবেই কোরবানির এই সম্পদ থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক মুনাফা পাওয়া সম্ভব হবে।

চামড়া বাজার নিয়ে কাজ করা গবেষক রায়ান আহমেদ রাজু সারাবাংলাকে বলেন, ‘রংপুরের চামড়া বাজারের এই চিত্র যেন সামগ্রিক বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের অবস্থা তুলে ধরেছে। সরকারি দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক পর্যায়ের এই মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা, যারা মূলধন সংকট ও নিপীড়নমূলক বাজার ব্যবস্থার কারণে বারবার পিছিয়ে পড়ছেন।’ সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিতে গভীর মনযোগ দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর