রংপুর: রংপুর নগরীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী শ্যামাসুন্দরী খাল আজ দখল-দূষণে মৃতপ্রায়। একসময় নগরবাসীর জীবনরেখা থাকলেও বর্তমানে এটি মশার প্রজননস্থল ও বর্জ্যের ভাণ্ডার। এই প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের ১০ কিলোমিটার সংস্কারে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কিন্তু খোদ বাস্তবায়নকারী সংস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, দখল ও পানি প্রবাহের মূল সংকট সমাধান ছাড়া এই প্রকল্প অর্থহীন ও টেকসই নয়। বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীরাও একমত—অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং ঘাঘট নদের সঙ্গে সংযোগ পুনরুদ্ধার না করলে এই অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই হবে না।
১৮৯০ সালে নির্মিত এই খাল একসময় প্রায় ১৫০ ফুট প্রশস্ত ছিল। অথচ, দীর্ঘমেয়াদি দখল ও দূষণে এর বেশির ভাগ অংশ আজ মাত্র ৩০ ফুটে নেমে এসেছে। নগরীর অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে এই খালের বেহাল দশাই রংপুর নগরীর প্লাবণের প্রধান কারণ।
বালতি দিয়ে ‘খনন’, অর্থ নেই প্রকল্পের কার্যকারিতায়
সরেজমিনে দেখা গেছে, খননের নামে বালতি দিয়ে কাদা ও আবর্জনা তুলে খালের পাড়ে ফেলা হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই এসব আবার গড়িয়ে খালে পড়ছে। নুরপুর এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলামের ভাষায়, ‘বালতি দিয়ে শ্যামাসুন্দরী খালের ময়লা তোলা হচ্ছে। সেই ময়লা পাড়ে ফেলা হয়েছে। সেগুলো বৃষ্টির পানিতে আবার খালে পড়ে জমাট বাঁধছে। এভাবে কাজ করলে কোটি কোটি টাকা নয়-ছয় হবে।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরে সারাবাংলাকে বলেন, ‘শ্যামাসুন্দরী এখন আর খাল নেই। এটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। খাল খনন ও সম্প্রসারণ হাইপোথিটিক্যাল হয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনে কেউ প্ল্যান দেওয়ার না থাকায় আমরাই প্ল্যান দিয়েছিলাম। এখন এটা আমাদের গলার কাঁটা হয়ে গেছে।’
খালের দুর্দশা ও সংকটের পটভূমি
শ্যামাসুন্দরী খালের জন্ম ইতিহাস বেশ নাটকীয়। ১৮৯০ সালে ডিমলার রাজা জানকি বল্লভ সেন ম্যালেরিয়ায় মায়ের মৃত্যুর পর মা শ্যামাসুন্দরীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি খনন করেন। সিও বাজার কেল্লাবন্দ এলাকায় ঘাঘট নদ থেকে উৎপত্তি হয়ে শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে মাহিগঞ্জ এলাকায় আবার ঘাঘট নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এই খাল।
একসময় প্রায় ১৫০ ফুট প্রশস্ত এই খাল বর্ষায় জলাবদ্ধতা নিরসন ও প্রায় ৫ হাজার জেলের জীবিকা নির্বাহের উৎস ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল ও দূষণে এটি আজ কালো দুর্গন্ধযুক্ত পানির ড্রেনে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) জরিপে ৪৪৩ দখলদারের তালিকা তৈরি করা হলেও স্থানীয়দের ধারণা প্রকৃত সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বাস্তবতার প্রতিফলন
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট শ্যামাসুন্দরী খাল রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন। আদালত খালের সীমানা নির্ধারণ, দখলদার উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান খালটি পরিদর্শন করে ১০ কিলোমিটার খনন ও ৬৮ পয়েন্টে বর্জ্য ফিল্টার করার উদ্যোগের কথা জানান। কিন্তু পাউবোর সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে বলেন, “শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে হলে আগে দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে এবং ঘাঘট নদের সঙ্গে সংযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধু ওপরের ময়লা সরিয়ে ‘ছবি তোলার’ মতো প্রকল্পে কোনো লাভ হবে না।”
যদিও স্থানীয়রা বারবার এর সংস্কার দাবি করছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, গত ২০ বছরে কয়েকবার খনন ও কোটি কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার পরেও কেন বারবার একই পরিস্থিতি ফিরে আসছে। এ বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, “পানি প্রবাহ ও নাব্যতা ফেরানো ছাড়া ভাসমান ময়লা সরালেই তা কিছুদিন পর আবার জমে। পাউবো এখন প্রকল্পটিকে ‘গলার কাঁটা’ বললেও, দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।”