ঢাকা: অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বরং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন। দুর্বল রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সমন্বয়ের অভাব, গোষ্ঠী স্বার্থ এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে অনেক ভালো উদ্যোগই ব্যর্থ হয়ে যায় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
রোববার (১৯ এপ্রিল) ঢাকায় ‘সানেম’র ৯ম বার্ষিক অর্থনৈতিক সম্মেলনের ‘রোমান্সিং দ্য রিফর্ম: দ্য বাংলাদেশ স্টোরি’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “দেশে ‘সংস্কার’ এখন এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হলেও প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা।” তিনি বলেন, ‘সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি করা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ।’
সংস্কারকে ‘রোমান্স’র সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ায় আশা, সংগ্রাম, বাধা-বিপত্তি, ধৈর্য ও পুনরুদ্ধারের গল্প জড়িয়ে থাকে।’ তার মতে, ‘সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি চলমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া; যা প্রেক্ষাপট, নেতৃত্ব ও জনমতের ওপর নির্ভর করে।’
তিনি বলেন, ‘সংকট, বাহ্যিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বৈষম্য বা দুর্নীতির মতো কারণেই সাধারণত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তবে এর সাফল্য নির্ভর করে সংস্কারের পরিধি, বাস্তবায়নের ধাপ, গতি এবং সংশ্লিষ্টদের মালিকানাবোধের ওপর।’
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সংস্কারের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠন, বেসরকারিকরণ, ভ্যাট চালু, বিনিময় হার সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ডিজিটালাইজেশন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়েছে।’
এর কারণ হিসেবে তিনি ‘লুণ্ঠনমূলক উত্তরাধিকার’র কথা উল্লেখ করে বলেন, “অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও ব্যবসায়ী অভিজাতদের যোগসাজশ সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ শক্তিশালী হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সংস্কার উদ্যোগ জোরালোভাবে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে গতি ও দিক হারিয়ে ফেলে।’ এর পেছনে সরকারের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করা এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধা অতিক্রম করতে না পারাকে দায়ী করেন তিনি।
জবাবদিহিতার অভাবের কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না, যার মাধ্যমে নাগরিকরা সরাসরি দেখতে পারতেন কোন সংস্কার বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ওপর সাবেক মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা ‘অলিগার্কিক’ প্রভাবের প্রতিফলন।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকট, বিশেষ করে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় রাজনৈতিকভাবে কঠিন, কিন্তু জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভর্তুকি যৌক্তিককরণ এবং সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি ‘