Saturday 23 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পাঁচ ঘণ্টার টানা বর্ষণে রংপুর নগরীর ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৩ মে ২০২৬ ১০:০০

রংপুর: টানা পাঁচ ঘণ্টার অতি বর্ষণে নগরীর ৪০টি পাড়া-মহল্লা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত ১৫ হাজার পরিবার।

শুক্রবার (২২ মে) ভোর ৪টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও শ্যামাসুন্দরী খালের বেহাল দশায় এ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ উপেক্ষা করেই এ সমস্যা চরম আকার ধারণ করেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুর নগরী যেন এক নিমজ্জিত শহরে পরিণত হয়েছে। থেমে থেমে নয়, একটানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে নামা বৃষ্টিতে নগরীর নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে গেছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৩০ মিলিমিটার এবং সকাল ৯টা পর্যন্ত আরও ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে লালবাগ, ধাপ, নিউ জুম্মাপাড়া, কুকরুল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাস, মাস্টারপাড়া, কামারপাড়া, বাবু খা, গনেশপুর, বালাপাড়া, বিনোদপুরসহ প্রায় ৪০টি এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমেছে।

বিজ্ঞাপন

নগরীর প্রধান সড়কগুলো নাব্যতা হারিয়েছে। আবহাওয়া অফিসের সামনের চারতলা মোড় থেকে মাস্টারপাড়া হয়ে বাবু খা পর্যন্ত সড়ক ২-৩ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবাহী যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। বৃদ্ধ আফছার আলী জানান, জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুতে এত বৃষ্টি আগে কখনও দেখেননি। ড্রেনগুলো পানি নিষ্কাশন করতে পারছে না। খোদ আবহাওয়া অফিসের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে।

শ্যামাসুন্দরী খালের বেহাল দশায় জলাবদ্ধতা চরমে

রংপুর নগরীর ফুসফুসখ্যাত শ্যামাসুন্দরী খালের বর্তমান অবস্থাই নগরীর এই জলাবদ্ধতার মূল কারণ। ১৮৯০ সালে শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য খালটি খনন করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দখল-দূষণের কারণে খালটি তার সক্ষমতা হারিয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে একটি গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্যামাসুন্দরী খাল এখন মশার প্রজননস্থল ও আবর্জনার ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।

নগরবাসী অভিযোগ করেছেন, খালটি সংস্কারের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এলাকাবাসী সম্প্রতি সংস্কার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে পানি নিষ্কাশনের এই প্রধান পথটি বন্ধ হয়ে গেছে। রংপুর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে মাত্র ৪৪১ কিলোমিটার ড্রেন আছে, অথচ প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি। অথচ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর পরও এখানে কোনো আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

রংপুর সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তেমন কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়নি। এলজিইডির এক প্রকল্পের আওতায় ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে শ্যামাসুন্দরী খাল ও বিভিন্ন সড়কে মোট ৬১৪০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পরও সেই ড্রেনগুলোর অধিকাংশই অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। সংস্কার ও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে এগুলো ময়লায় ভরাট হয়ে গেছে।

নগরবাসীর চরম দুর্ভোগ ও ক্ষোভ

পানিবন্দি হয়ে পড়া ১৫ হাজার পরিবারের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। মাস্টারপাড়ার পশ্চিম ও দক্ষিণ বাবু খা এবং গনেশপুর এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে প্রতিটি ঘরে পানি ঢুকে গেছে। আসবাবপত্র থেকে শুরু করে জিনিসপত্র সব তলিয়ে গেছে। দোকানদার মমতাজ বেগম জানান, তার দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে হাজার হাজার টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।

শুধু ঘরবাড়ি নয়, নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ দুর্ভোগ থেকে রেহাই পায়নি। অনেক স্কুল-মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। সড়কে জমে থাকা পানি ও পচা আবর্জনার দুর্গন্ধে চলাচল দুঃসহ হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির পানি নেমে যেতে না পারায় নিচু এলাকাগুলোতে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।

নীলকণ্ঠ সোটাপীর এলাকার বাসিন্দা ফজলার রহমান বলেন, ‘এই এলাকায় কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থাই নেই। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে যায়। আমাদের এলাকার এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। অনেক চেষ্টা করেও কোনো সমাধান হচ্ছে না।’ বাবুখা এলাকার রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, প্রতি বছর বৃষ্টির মৌসুমে আমাদের এলাকা ডুবে যায়। সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাস দেয়, কাজের কাজ কিছুই হয় না।

রংপুর সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের ভূমিকা

এমন অবস্থায় রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে।’ তবে তিনি শ্যামাসুন্দরী খাল খননে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি নিয়ম মেনে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এদিকে সম্প্রতি নগরীর নতুন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল পুনঃখননের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এছাড়া আরপিসিসি প্রশাসক ডন শ্যামাসুন্দরী খাল, ইছামতী নদী ও কুকরুল বিল সংস্কারের মাধ্যমে নগরীকে সবুজ ও বাসযোগ্য করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, এসব কথা কেবল সংবাদ সম্মেলন আর সেমিনারেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবায়ন হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

রংপুরের এই বন্যা পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেও ইঙ্গিত করছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মে মাসে রংপুরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। গত কয়েক বছরের বৃষ্টিপাতের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রংপুরে মে মাসে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৩৩৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার, যা দিনভিত্তিক হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১২-১৫ মিলিমিটার। কিন্তু মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় ১৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত এক ধরণের ‘ক্লাউডবার্স্ট’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান জানিয়েছেন, এমন বৃষ্টিপাত আরও হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পানিবাহিত রোগের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জলাবদ্ধ এলাকাগুলোতে পানিবাহিত রোগের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা পরিষ্কার পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, ‘বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনে শ্যামাসুন্দরী খাল ও অন্যান্য জলাধার পুনঃখননের কোনো বিকল্প নেই। রংপুর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ যদি পরিকল্পিতভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতো তাহলে এমন সমস্যা হতো না।’

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর