Sunday 17 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রংপুরে প্রতি তিনজনে একজন দরিদ্র, শহরমুখী হচ্ছে মানুষ

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৭ মে ২০২৬ ১১:৫৯ | আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ১২:১০

কাজের অপেক্ষায় মানুষ।

রংপুর: নগরায়ণের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত রংপুর নগরীতে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য সব মহানগরের চেয়ে অনেকটাই বেশি। কর্ম আর খাবারের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে মানুষজন শেষমেষ ঠাঁই নিচ্ছেন শহরের বস্তিতে। বাড়ছে বস্তির সংখ্যা, বাড়ছে ভোগান্তি, বদলাচ্ছে দারিদ্র্যের ধরন। সরকারি হিসেবে উঠে এসেছে, রংপুর বিভাগের শহরগুলোতে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ (২৯.৯ শতাংশ)। প্রতি তিনজনে একজনের দিন চলে অনিশ্চিত পথে। দারিদ্র্যের ধরন বদলে ‘ক্ষুধার দারিদ্র্য’ থেকে এখন ‘পুষ্টির দারিদ্র্য’ প্রকট। বস্তির সংখ্যা বাড়লেও নেই সরকারি কর্মসূচি, নেই বরাদ্দ। নদীভাঙন ও কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ ছুটছে শহরে, কিন্তু শহর তাদের ধরে রাখতে পারছে না।

বিজ্ঞাপন

রংপুর নগরের সাতমাথা পেরিয়ে হারাগাছ পৌরসভার দিকে কিছু দূর এগোতেই চোখে পড়ে টিনের চালার ছোট ছোট ঘর। ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের এই স্থানটি একসময় ‘নাছনিয়া বিল’ নামে পরিচিত ছিল, এখন এটি ‘নাছনিয়া বস্তি’ নামে বেশি পরিচিত। ২০১০ সালে এক একর সরকারি জমিতে রাতারাতি গড়ে ওঠা এই বস্তিটিতে বর্তমানে ১৯৫টি পরিবারের প্রায় হাজারখানেক মানুষ বসবাস করেন। নাছনিয়া শুধু একটি উদাহরণ, রংপুর নগরজুড়ে এমন অসংখ্য বস্তি গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে, যেখানে নিরন্ন মানুষের ঢল নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, রংপুর বিভাগের শহরগুলোতে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য সব বিভাগের চেয়ে বেশি—এখানে প্রতি তিনজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। অথচ এই দরিদ্র মানুষদের জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে নেই কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএসে) খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ হলেও রংপুর বিভাগের শহরগুলোতে এই হার ২৯.৯ শতাংশ, যা আট বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ রংপুর বিভাগের শহরাঞ্চলে বসবাসকারী প্রতি তিনজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছেন। অথচ বিভাগের সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ২৪.৮ শতাংশ, যার মানে শহরাঞ্চলেই দরিদ্র মানুষের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।

শুধু তাই নয়, বিবিএসের তথ্য বলছে, রংপুরই বিভাগ যেখানে গ্রামের চেয়ে শহরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। তুলনামূলকভাবে খুলনা বিভাগে নগর-দারিদ্র্যের হার মাত্র ৯.৯ শতাংশ, ঢাকায় ১৪.৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১১.৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান রংপুরের নগর-দারিদ্র্যের ভয়াবহতাই চিহ্নিত করে না, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দিকেও ইঙ্গিত করে।

শহরে কেন বাড়ছে দরিদ্রদের ভিড়?

রংপুর নগর ও এর আশপাশের বস্তিগুলোতে কথা বলে পাওয়া গেছে একটি অভিন্ন সুর—গ্রামে আর নেই ঠাঁই, নেই কাজ।

নাছনিয়া বস্তির চা দোকানি ৬০ বছর বয়সী মোসলেমা বেগম বলেন, বাড়ি তিস্তা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে তাই এদিকে ঠাঁই হয়েছে। তিনি বলেন, কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ডাংরার হাটে ছিল আমার বাড়ি। শুধু নদীভাঙন নয়, চরম দারিদ্র্যও আমাদের উৎপাটিত করেছে। খুব কষ্ট ছিলো। আমার স্বামী এখানে এসে রিকশা চালায়।

একই চিত্র নগরীর ১৭ নম্বর গাইবান্ধাটারী বস্তিতে। ৮৯ বছর বয়সী আবদুস সামাদ বলেন, ‘১৮ বার তিস্তায় বাড়ি ভাঙার পর ১৯ বারে আসছি।’ কুড়িগ্রামের থেতরাই থেকে আসা এই প্রবীণ এখন গরুর ঘাস কেটে সংসার চালান। জাহানারা বেগমের বাড়ি ছিল গাইবান্ধা সদরের কামারজানিতে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সব হারিয়ে সাত বছর বয়সে এসেছিলেন এই বস্তিতে, আজ তার বয়স ৬২ বছর।

গবেষকদের মতে, নদীভাঙন মূল কারণ হলেও প্রধান কারণ নয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপনের মতে, ‘ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদী বড় একটি ‘ফ্যাক্টর’। কিন্তু নদীভাঙন, খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যারা নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন, তাদের জন্য গত কয়েক বছরে তেমন কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ‘মাথা গোঁজার ঠাঁই কিংবা তিন বেলা খাওয়ার তাগিদে শহরকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা ছাড়া তাঁদের বিকল্প নেই।’

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের আলট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন (ইউপিজি) প্রোগ্রামের রংপুরের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক শাহানা আখতার বলেন, ‘কাজের জন্য নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও আশপাশের জেলার মানুষ রংপুর শহরে ভিড় করছেন। এতে শহরের মানুষের জন্য কাজের সংকট আরও বাড়ছে।’

বদলে যাওয়া দারিদ্র্যের চেহারা: এখন ‘পুষ্টির দারিদ্র্য’

রংপুরের বস্তিগুলোতে এখন আর শুধু ‘ক্ষুধার দারিদ্র্য’ নেই, দেখা দিয়েছে ‘পুষ্টির দারিদ্র্য’। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক উত্তম দাস বলেন, ‘আগে ক্ষুধার দারিদ্র্য ছিল। এখন পুষ্টির দারিদ্র্য দেখা যাচ্ছে।’

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ রংপুর সিটি করপোরেশনের সাতটি ওয়ার্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, অন্তত দুটি সূচকে (যেমন বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম) ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের সংখ্যা ৯ হাজার ৩১৯টি। তাঁরা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি জরিপ করে ভয়াবহ তথ্য পেয়েছেন: ‘১০০ শিশুর মধ্যে ৬০ জনের সবকিছু স্বাভাবিক থাকে। বাকি ৪০ জনের মধ্যে ২০ জন মাঝারি ও ২০ জন মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগে।’ মাঝারি অপুষ্টি আপাতত নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

নগরীর আকালিটারি এলাকায় ভাড়া থাকা রিকশাচালক হেকমত আলীর (৫০) কথায় ফুটে ওঠে অনানুষ্ঠানিক খাতের অস্থিরতা। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা এই রিকশাচালক বলেন, ‘আমার এলাকায় কাজ থাকলে আমি কখনোই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় এসে কাজ করতাম না।’

বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে ৮২.৭৮ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কর্মস্থলের সঙ্গে যুক্ত। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, দেশের নগর এলাকায় কর্মসংস্থানের বড় একটা অংশই অনানুষ্ঠানিক। রংপুরের চিত্র আরও ভয়াবহ।

শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান রিপন মনে করেন, নগরের অনিয়ন্ত্রিত ইজিবাইকের পেছনেও এই কর্মসংস্থানের অভাবই কারণ। তিনি বলেন, ‘নগরে প্রতিদিন হাজার হাজার ইজিবাইক চলছে। কিন্তু ইজিবাইকে যাত্রী থাকে দুই-তিনজন। কাজের সংকটের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ উপায়হীন হয়ে ইজিবাইক ভাড়া নিয়ে রাস্তায় বের হচ্ছেন।’

শহরে বাড়ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠির ভিড়।

সিটি করপোরেশনে নেই কর্মসূচি, নেই বরাদ্দ

রংপুর সিটি করপোরেশনের অলি-গলিতে যখন মানুষের দুর্ভোগের শেষ সীমা, তখন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের হাত প্রায় শূন্য। সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. সেলিম মিয়া স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা খুব কম সরকারি বরাদ্দ পেয়েছি। ইউএনডিপি, জাইকার বিভিন্ন প্রকল্পসহ স্থানীয় এনজিও ইএসডিওর মাধ্যমে কিছু দরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। তবে এখন দরিদ্র লোক ও বস্তিবাসীর জন্য ফান্ড নেই।’

এদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আরও কঠোর সত্য তুলে ধরে বলছেন, গত দুই অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ ছিল শূন্য। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নতুন ১২টি প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হলেও সেগুলোর অধিকাংশই অবকাঠামোভিত্তিক। দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানমুখী তেমন কোনো প্রকল্প নেই।

গত ১৬ মার্চ রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়া মাহফুজ উন নবী চৌধুরী এমন পরিস্থিতি স্বীকার করেন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে ৭০ শতাংশের বেশি নিম্ন আয়ের মানুষ আছেন।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের এ অঞ্চল নিয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। তবে দ্রুত নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তেমন কিছু করার নেই।’

অথচ, সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক যৌথ জরিপ ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার আরও বেড়েছে বলে চিহ্নিত করেছে। রংপুরে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নদীভাঙন পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।

যা প্রয়োজন এখন

মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহামুদুল হক মনে করেন, রংপুরের নগর-দারিদ্র্য এখন আর শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি একটি সক্রিয় মানবিক সংকট।

তিনি বলেন, ‘নদীভাঙন ও গ্রামীণ দারিদ্র্যের পরিণতি হিসেবে মানুষ শহরে এসে ঠাঁই নিচ্ছে, কিন্তু শহর সেই মানুষের জন্য প্রস্তুত নয়। কেবল অবকাঠামো নয়, বরং নগরে এসে আশ্রয় নেওয়া এসব পরিবারের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ, শিশু শিক্ষা ও সঠিক পুষ্টির নিশ্চয়তা জরুরি। অন্যথায়, রংপুরের নগর-দারিদ্র্য দেশের অন্যান্য বিভাগের জন্য একটি বাজে উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর