রংপুর: ঈদুল আজহার আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার গরু খামারি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। কোরবানির হাট শেষে বিপুল সংখ্যক গরু অবিক্রিত থেকে যাওয়ায় লোকসানের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েছেন তারা। নিজেদের সঞ্চয় আর ঋণের টাকা বিনিয়োগ করে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ধুলিস্মাৎ হয়ে গেছে। এখন অবিক্রিত গরুগুলোর পেছনে প্রতিদিনই খরচ বেড়েই চলেছে। অথচ, সামনে নেই কোনো ভবিষ্যৎ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সরবরাহ এবং প্রকৃত ক্রেতার অভাবে এই দুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে। গতবছর ভারতীয় গরু না আসায় দাম ভালো পাওয়ার আশা করলেও, বিপরীতে রেকর্ড পরিমাণ স্থানীয় পশু উৎপাদনই হয়ে দাঁড়াল বড় অভিশাপ।
সারা বছরের পরিশ্রম ভেঙে চুরমার
রংপুর সদর উপজেলার খাসবাগ গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী কৃষক আনোয়ার আলীর কণ্ঠে এখন শুধুই হতাশা। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সারা বছর পাঁচটি ষাঁড় লালন করেছি। আশা ছিল প্রতিটি দেড় লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি করব। কিন্তু হাটে পাঁচ দিন থেকেও মাত্র তিনটি বিক্রি করতে পেরেছি, তাও কম দামে। বাকি দু’টি আবার বাড়ি ফিরিয়ে এনেছি। এখন প্রতিদিন প্রত্যেকটি গরুর পেছনে ২৫০ টাকা করে খাবার খরচ হচ্ছে। কতদিন এভাবে চালাতে পারব জানি না।’
শুধু আনোয়ার আলীই নন, পীরগঞ্জ উপজেলার সোনাতলা গ্রামের জলিল মিয়াও একই বাস্তবতার শিকার। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি গরু ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষে মাত্র ১ লাখ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। এ বছর গরুর খামার করে কোনো লাভ করতে পারিনি। এখন বাড়িতে ফিরিয়ে আনা দুই গরু নিয়ে বিপদে আছি। ক্রেতা খুঁজছি। পেলেই বিক্রি করে দেব।’
এমন পরিস্থিতিতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যাংক বা এনজিওর ঋণের টাকা পরিশোধের কোনো পথ না পেয়ে অনেকে এখন নিদারুণ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
৬ লাখ পশুর অতিরিক্ত সরবরাহই বিপর্যয়
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রংপুর বিভাগের আট জেলায় কোরবানির জন্য প্রায় ২০ লাখ গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। অথচ চাহিদা ছিল মাত্র ১৪ লাখ। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল প্রায় ৬ লাখ বেশি, যা এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।
রংপুরের লালবাগ গরুর হাটের ইজারাদার শহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, হাটে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পশু বিক্রি হয়েছে। বাকি ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ গরু কৃষকদের বাড়ি ফিরিয়ে নিতে হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ সংকেত।
দেশি গরুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরেই রংপুর বিভাগে প্রাণিসম্পদ খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। একসময় যেখানে ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভর করতে হতো, সেখানে এখন দেশি খামারিরাই উদ্বৃত্ত পশু উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা আর ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা না থাকায় এই আত্মনির্ভরশীলতা যেন দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ভারতীয় গরু এনে দাম কমিয়ে দেওয়ার যে সমস্যা ছিল, এখন সেই একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে দেশি গরুর অতিরিক্ত সরবরাহে।
পুঁজি ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে খাবার খরচ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গরু লালন-পালনে সাধারণত ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগে। খাবার, আশ্রয়, ওষুধ ও পরিচর্যাসহ এতে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। নগরীর মাহিগঞ্জের খামারি মেহেরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি আটটি ষাঁড় এনে মাত্র চারটি বিক্রি করতে পেরেছি। বাকি চারটি নিয়ে এখন প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা খরচ করছি। আমার মতো অনেক খামারির একই দশা।’
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে আর এ পেশায় টিকে থাকতে পারবেন বলেও মনে করছেন না খামারি মেহেরুল। এদিকে রংপুরের খামারি হাবিবুর রহমানের কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ, ‘সব বিক্রি হলেও দাম প্রত্যাশার অনেক নিচে ছিল। কোনো লাভ হয়নি। সত্যি বলতে, আমি আর এ ঝুঁকি নিতে চাই না।’