রংপুর: নগরীর ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত সড়কটি ‘ভিআইপি সড়ক’ নামে পরিচিত। প্রায় ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এ সড়কের সংস্কার, বর্ধিতকরণ ও ফুটপাত নির্মাণ কাজ চলছে। তবে নির্মাণকাজের শুরুতেই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের কাজ চলাকালেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। এছাড়া নিম্নমাণের ইট-পাথর, এমনকি কোথাও ইটের পরিবর্তে বালু ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে। এতে বর্ষায় সড়ক ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে- সরকারি নির্দেশে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী অপসারণের নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সড়কটির আধুনিকায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১০ কোটি ৬৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯২১ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ‘খায়রুল কবীর রানা’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের পাশে সার্কিট হাউস, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের বাসভবনসহ সেনাবাহিনীর স্থাপনা রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিম্নমানের কাজ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলফাজ রহমান বলেন, ‘৩২ বছরের চাকরিজীবনে এত নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সড়ক নির্মাণ দেখিনি। এখানে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে সরকারি অর্থ অপচয় করা হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই আরসিসি ড্রেন নির্মাণে নিম্নমানের পাথর, রড ও বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। সড়ক সম্প্রসারণ অংশে প্রথম শ্রেণির ইটের পরিবর্তে তৃতীয় শ্রেণির ইটের খোয়া ও ভিটি বালু দিয়ে গর্ত ভরাট করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ইটের পরিমাণ কম দিয়ে শুধু বালু দিয়েই কাজ শেষ করা হচ্ছে।
রংপুর টিচার্স ট্রেনিং কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের কাজে এমন অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। প্রকৌশলীদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। বর্ষা এলে সড়ক ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

সম্প্রতি অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা সিটি করপোরেশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। মমতাজ বেগম নামের এক সরকারি চাকুরিজীবী জানান, তারা দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী মানসম্মত সামগ্রী দিয়ে কাজ করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলী আজম অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছি। সেগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছি।’
তবে প্রশাসনের নির্দেশ সত্ত্বেও কেন নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চলছে—সে বিষয়ে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
নগরজুড়ে সড়কের বেহাল দশা
শুধু এই প্রকল্পই নয়, রংপুর নগরীর সামগ্রিক সড়ক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৩০২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩৩টি ওয়ার্ডে মোট ১ হাজার ৪৫৬ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পাকা সড়ক বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে জেলায় ৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১ জন নিহত এবং ৩৫৬ জন আহত হয়েছেন।
গত জুলাইয়ে জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে সাতমাথা পর্যন্ত সড়কের বেহাল অবস্থার প্রতিবাদে স্থানীয়রা প্রতীকী জানাজা আয়োজন করে সিটি করপোরেশনকে ‘মৃত’ ঘোষণা করেছিলেন।
থমকে বড় প্রকল্প
এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রায় ১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকার একটি বড় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প গত দেড় বছর ধরে আটকে রয়েছে। ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও পরিকল্পনা কমিশন বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে।
সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, নগরীর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে অন্তত ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন, যা এডিপির বরাদ্দ ছাড়া সম্ভব নয়।
নগরবাসীর প্রত্যাশা ছিল, ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ১০ কোটি টাকার সড়কের এই প্রকল্পটি উন্নয়নের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। তবে কাজের শুরুতেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় হতাশা বাড়ছে। বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার আগেই যদি মানসম্মত কাজ নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে সড়কটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।