রংপুর: গঙ্গাচড়ায় কৃষকদের বসতবাড়িতে সংরক্ষণের অভাবে সুতলি পোকার আক্রমণে নষ্ট হচ্ছে সংরক্ষিত আলু। আর নষ্ট আলু রাস্তার ধারে ও খাল-বিলে ফেলে দিচ্ছেন কৃষকেরা। কম বাজারদরের মধ্যেই এই দুর্বিপাক কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ সব তথ্য জানা গেছে। আগাম বৃষ্টির কারণে মাঠে কিছু আলু ভিজে যায় এবং তা বাড়িতে সংরক্ষণের পর পোকার আক্রমণ শুরু হয় বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
ক্ষতির মাত্রা ও কৃষকের হতাশা
উপজেলার চেংমারী ইউনিয়নের কুড়িয়ার মোড় এলাকার কৃষক আশেকুল ইসলাম এক একর ৩২ শতাংশ জমিতে আলু চাষ করে। তিনি প্রতি বস্তা ৬৫ কেজি হিসাবে প্রায় ২০০ বস্তা আলু পেয়েছিলেন। ২৫ বস্তা হিমাগারে পাঠানোর পর বাকি আলু বাড়িতে স্তূপ করে রাখায় নষ্ট হয়ে গেছে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘নিজের পরিশ্রম বাদে দেড় লাখ টাকা খরচ হইছে। পাইকারেরা বাড়িতে রাখা আলু নেয় না। সব নষ্ট হইছে।’
একই এলাকার নারী কৃষক বিউটি বেগম সারাবাংলাকে জানান, তাদের ৪০ বস্তা আলু পচে গেছে, যা ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এলাকায় প্রায় ৫০-৬০ জন কৃষক একই সমস্যায় পড়েছেন।

আলুতে সুতলি পোকার থাবা, সর্বশান্ত হচ্ছেন রংপুরের গঙ্গাচড়ার কৃষকরা। ছবি: সারাবাংলা
কৃষকদের ভাষ্য, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ ১৫-১৮ টাকা হলেও বাজারে দাম ছিল মাত্র ৭-১০ টাকা। তার ওপর সংরক্ষণের অভাবে আলু নষ্ট হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়িতে রাখা আলুর প্রায় ৮০ শতাংশই সুতলি পোকার আক্রমণে নষ্ট হচ্ছে।
কারণ ও প্রতিকার
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আলুতে আর্দ্রতা বেশি থাকলেই সুতলি পোকার আক্রমণ হয়। এ বিষয়ে কৃষকদের আগে থেকেই পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকে তা মানেননি। গঙ্গাচড়া উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মারুফা খাতুন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সুতলি পোকা আলু ছিদ্র করে ও পচিয়ে ফেলে। এ জন্য মাচা তৈরি করে আলু সংরক্ষণ করা উচিত।’
বিশেষজ্ঞ ও কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আলুর আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত বাছাই এবং ছাই, বালি বা কাঠের গুঁড়ার আবরণ ব্যবহার করলে আক্রমণ কমানো যায়। এ ছাড়া বিষকাঁঠালি বা নিমপাতার গুঁড়া কার্যকরী ভূমিকা রাখে। বর্তমানে করণীয় হচ্ছে, পোকার আক্রমণ দেখামাত্র আক্রান্ত আলু আলাদা করে সরিয়ে ফেলা এবং সুস্থ আলু বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখা। তবে, বেশিরভাগ কৃষক বাড়িতে আলু স্তূপ করে রেখেছিলেন, যা এ সমস্যার প্রধান কারণ।

আলুতে সুতলি পোকার থাবা, সর্বশান্ত হচ্ছেন রংপুরের গঙ্গাচড়ার কৃষকরা। ছবি: সারাবাংলা
আলুর নষ্ট বস্তা যেভাবে ফেলছেন কৃষকেরা
কৃষকেরা নষ্ট আলু পুকুর, খাল-বিল কিংবা গর্ত করে ফেলে দিচ্ছেন। তবে, পচা আলু এভাবে ফেলার ফলে পরিবেশ দূষণ ও অন্যান্য রোগবালাই ছড়ানোর আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।
এদিকে কৃষি বিভাগ কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে বলছে, ফ্যানের বাতাস বা রোদে আলু ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। নষ্ট আলু সঙ্গে-সঙ্গেই আলাদা করে ফেলতে হবে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক উপায়ে নিমপাতা, বিষকাঁঠালি বা কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করলে পোকার আক্রমণ কমবে। তবে অতিরিক্ত স্তূপ করে সংরক্ষণ না করে মাচা তৈরি করে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করাই উত্তম বলে মনে করেন কৃষি কর্মকর্তারা।