ঢাকা: রাজধানীর তেজগাঁওয়ের টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কার্যালয়ে চোর সন্দেহে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার পরপরই নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা আনসার বাহিনী ও বিটিসিএল থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিটিসিএল দায় এড়িয়ে গেলেও আনসার সদস্যরা জড়িত থাকার খবর ভিত্তিহীন বলে জানানো হয়েছে।
এদিন, সকাল সাড়ে ৭টায় তেজগাঁও টি অ্যান্ড টি তার ভান্ডার এলাকায় কয়েকজন যুবক অনুপ্রবেশ করে। এসময় একজনকে ধাওয়া করে আটকের পর বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মিলে ওই যুবককে (২৫) পেটানো হয়। এমনকি, ওই অবস্থাতেই তাকে বেঁধে রাখা হয়। পরে দুপুর ২টার দিকে ওই যুবককে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে এই ঘটনায় আনসার ও বিটিসিএল-এর পক্ষ থেকে দায় এড়ানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঘটনায় সময় উপস্থিত বিটিসিএল-এ কর্মরত এক কর্মচারী শওকত আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আমি কাজ করছিলাম। তখন শব্দ পেয়ে গিয়ে দেখি এক ব্যক্তিকে আটক করে কয়েকজন আনসার সদস্য পেটাচ্ছে। পরে আনসাররা ওই ব্যক্তিকে তাদের জিম্মায় নিয়ে বেঁধে রাখে। আর দুপুর ২টায় বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সিএনজিতে করে আটক ব্যক্তিকে আমরা দুইজন মিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই।’
বিটিসিএল-এর অফিস সহকারী মো. সাইফুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি সকাল ৯টার দিকে অফিসে এসেছি। এরপর শুনি একজনকে চোর সন্দেহে আটক করেছে আনসার সদস্যরা। তাকে বেঁধে রাখা অবস্থায় দেখে মনে হয়েছে যে মারধর করা হয়েছে এবং তাকে প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় দেখা গেছে। পরে আমাদের স্যারের পিএ-র নির্দেশে দুপুরে সিএনজিতে করে আটক ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।’
এদিকে, আটক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে। তবে এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহকারী পরিচালক ও গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. নাজমুস সাকিব।
সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা বাহিনী কর্তৃপক্ষের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভিত্তিহীন ও বাস্তব ঘটনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। আজ সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে তেজগাঁও টি অ্যান্ড টি তার ভান্ডার এলাকায় কয়েকজন যুবক অনুপ্রবেশ করে। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্য শাহজামাল এক যুবককে চুরি করতে দেখেন এবং তাকে ধাওয়া করেন। পুরনো টিনের চালের উপর দিয়ে দৌড়ানোর একপর্যায়ে চোর চাল ভেঙে নীচে পড়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে বিটিসিএল সংস্থার ষ্টাফ মো. শওকত হোসেন ওই যুবককে আটক করেন। সংস্থার টেলিফোনিক নির্দেশে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যরা তাকে আটক করতে সহযোগিতা করেন। এমনকি, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী আনসার সদস্যদের মধ্যে পিসি নুরুল ইসলাম আটককৃত চোরকে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের পি.ও. সুলতান মাহমুদ এবং ইলেকট্রিশিয়ান সাইফুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিজ নিজ দায়িত্বস্থলে ফিরে যান।’
নাজমুস সাকিব বলেন, ‘আনসার সদস্যরা আটক যুবককে ক্যাম্পে নিয়ে মারধর করেছে এবং এর ফলে তার মৃত্যু হয়েছে বলে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, সেটির সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার কোনো সামঞ্জস্য নেই। ওই যুবককে আনসার সদস্যরা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছেন বা মারধর করেছেন, এমন তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। আটক ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে আনসার সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনো ধরনের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, নির্যাতন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনকে প্রশ্রয় দেয় না। একই সঙ্গে কোনো ঘটনার বিষয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রচারিত হলে তা বাহিনীর ভাবমূর্তি ও জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
এবিষয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘চুরির সন্দেহ থাকলেও কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা দণ্ডনীয় অপরাধ। আনসার এবং বিটিসিএল—উভয় পক্ষের বক্তব্যই আমরা তদন্ত করে দেখছি। ঘটনায় যারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। খুব শিগগিরই হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।’