ঢাকা: জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত দিয়েছেন। জনগণের সেই রায়কে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করা হলে তা দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা দীর্ঘ সাত মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা করে অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সনদ তৈরি করেন। সেই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকেই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এতে সই করেছিল।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী চেয়েছিল আগে গণভোট, পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু একই দিনে দুটি ভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনকে গুলিয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্য হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
‘সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কার আটকে রাখা যাবে না’
জামায়াতের আমির বলেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ অতীতে সংবিধান মেনেই সভা-সমাবেশ ও আন্দোলন হয়েছে। তারপরও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়নি।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সংবিধান মেনে আন্দোলন, মিছিল ও সভা-সমাবেশ করেও যখন ফ্যাসিবাদকে তাড়ানো যায়নি, তখন এখন সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কার আটকে রাখার চেষ্টা কেন? সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে সরকারের উচিত নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বিএনপি জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। বরং সরকারে যাওয়ার পর তারা অতীতের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
তিনি বলেন, আমরা অতীতের পচে যাওয়া রাজনীতি আর দেখতে চাই না। আমরা পরিবর্তন চাই, সংস্কার চাই। আমাদের সন্তানেরা এ জন্য জীবন দিয়েছে। তারা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ ও ন্যায়বিচার চেয়েছিল। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি; বরং বৈষম্য আরও বাড়ছে।
বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভোট চাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের কাছে ভোট চাওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারাও বিভিন্ন বক্তব্যে বিএনপিকে নির্বাচনে সহযোগিতা করার দাবি করেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ বিএনপি ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান পাচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত তথ্য তিনি বক্তব্যে তুলে ধরেননি।
চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধের দাবি
দেশে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজির কারণে সাধারণ মানুষকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। পঞ্চগড়ে চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রির খবরের উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদিকে কৃষক পণ্যের দাম পাচ্ছেন না, অন্যদিকে রাজধানীতে একই পণ্য অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রবাসে অস্থিরতার কারণে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। রাগ মেডিকেল সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, শুধু পদত্যাগ করিয়ে কোনো অপরাধের দায় শেষ করা যায় না; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র প্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ
সীমান্ত দিয়ে অর্থ, অস্ত্র ও মাদক প্রবেশের অভিযোগ তুলে সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের আমির।
তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অর্থ, অস্ত্র ও মাদক প্রবেশ করলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে সরকার ব্যর্থ হলে দেশ পরিচালনায় তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
‘আমরা দলীয় দাবি নিয়ে মাঠে নামিনি’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী কিংবা ১১ দলীয় ঐক্য কোনো দলীয় দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামেনি; তারা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছে। আমাদের প্রতিটি দাবি জনগণের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা লড়াই করছি। কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করব না।
তিনি আরও বলেন, তাদের আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। কেউ যেন তাদের ওপর বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
লংমার্চে জনগণের সাড়া নেই- এমন সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, সাড়া না থাকলে এ নিয়ে এত আলোচনা বা উদ্বেগের কারণ থাকত না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ায় লংমার্চ
বক্তব্যে আগামী লংমার্চের কর্মসূচিও ঘোষণা করেন জামায়াতের আমির। তিনি জানান, ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে লংমার্চ শেষ হবে।
এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো ষড়যন্ত্র না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতেও বাধা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আন্দোলনের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবারও কোনো বাধা আন্দোলনকারীদের থামাতে পারবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি একটি মুক্ত, মানবিক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। যুবসমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব মো. আখতার হোসেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এবি পার্টির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ, মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মো. সেলিম উদ্দিন, কামাল হোসেন এমপি, জুলাই শহীদ জাবেরের মা রোকেয়া বেগম এমপি প্রমুখ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, ডিইউজের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির।