Friday 30 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ইবিএলের পরিচালকের নিয়ন্ত্রণে বেনামি শেয়ার, অভিযোগ ‘সেফ এক্সিট’ সুবিধার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:৫৬ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৪৭

ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল)–এর সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী – ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল)–এর সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাংকটির ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ থাকার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল। ব্যাংক কোম্পানি আইনে কোনো ব্যক্তি, তার পরিবার বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণের সীমা ১০ শতাংশ হলেও তার ক্ষেত্রে সেই সীমা অতিক্রমের তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত শওকত আলী চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণাধীন শেয়ারের পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক ১০ শতাংশ। পরে তা কমে ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়ায়।

বিজ্ঞাপন

তবে বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার কয়েক মাস পরও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনে বেনামি বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ইবিএলের বিপুল শেয়ার বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ফলে তদন্তে প্রশ্ন ওঠা শেয়ারের একটি বড় অংশ হাতবদল হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে গত ১৯ আগস্ট দেওয়া এক আবেদনে এসব অভিযোগ করেছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। তিনি গত ২৯ মার্চ এ বিষয়ে মূল অভিযোগ করেছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শওকত আলী চৌধুরীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইবিএলের ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার। এর মধ্যে তাঁর নিজের, স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারিন, দুই কন্যা জারা নামরীন ও সাবাহ সামরিন, ছেলে জারান আলী চৌধুরী এবং নামরীন এন্টারপ্রাইজ ও জেড.এন. এন্টারপ্রাইজের নামে থাকা শেয়ার অন্তর্ভুক্ত।

আর পরোক্ষভাবে আরও ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান—মেসার্স আরুসা অ্যান্ড কোং (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড।

সব মিলিয়ে শওকত আলী চৌধুরীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন শেয়ারের পরিমাণ ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ডেপুটি গভর্নর-৩-এর ১৩ এপ্রিলের অনুমোদনের পর ইবিএলের প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ পরিদর্শন পরিচালনা করা হয়। ব্যাংক থেকে পাওয়া বিভিন্ন নথি, শেয়ারহোল্ডিং প্রতিবেদন, স্থিতিপত্র, আয়কর নথি এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নথি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

বিশেষ পরিদর্শনে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে আরুসা অ্যান্ড কোংকে ঘিরে। ২০০১ সালের ৮ জুলাই চট্টগ্রামের আরজেএসসি থেকে মাত্র এক লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন হয়। নিবন্ধনের মাত্র ১৭ দিন পর, ওই বছরের ২৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির নামে ইবিএলের শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এরপর ২০০২ সালে আরুসা ইবিএলের ৭ লাখ ১৮ হাজার ৮০টি শেয়ার কেনে। তখন এসব শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

২০০৩ সালের ৩০ জুনের স্থিতিপত্রে ওই বিনিয়োগের উৎস হিসেবে দেখানো হয় এক লাখ টাকা মূলধন, ১ কোটি ১৯ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ক্যাপিটাল রিজার্ভ, ৩ কোটি ৪ লাখ ৪ হাজার ২৭০ টাকা ভেন্ডরস হিসাবে দায় এবং ৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬৩ হাজার ৯৪৮ টাকা মুনাফা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র এক লাখ টাকা মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করা একটি প্রতিষ্ঠানের প্রথম সমাপ্ত অর্থবছরেই প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা মুনাফা এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ক্যাপিটাল রিজার্ভ দেখানো অস্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

পরবর্তীকালে শেয়ার কেনা এবং স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে আরুসার হাতে ইবিএলের ১৫ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার ২৯২টি শেয়ার জমা হয়। এতে ইবিএলের মোট পরিশোধিত মূলধনের ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির নামে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন এসব শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

অর্থাৎ মাত্র এক লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে গঠিত একটি কোম্পানির হাতে কয়েক বছরের ব্যবধানে ইবিএলের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শেয়ার চলে যাওয়ার বিষয়টিকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল।

আরুসা অ্যান্ড কোংয়ের মালিকানা কাঠামো নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার সময় আরজেএসসিতে জমা দেওয়া ফর্ম-৯ অনুযায়ী, কোম্পানিটির পরিচালক ছিলেন নইমুল হক ও আনিকা তাহজীব। তখন এক হাজার শেয়ারের মধ্যে ৯৫০টি ছিল নইমুল হকের নামে এবং ৫০টি আনিকা তাহজীবের নামে।

২০০৭ সালের ১০ এপ্রিল আনিকা তাহজীবের শেয়ার নইমুল হকের স্ত্রী সালমা শিরিনের নামে স্থানান্তর করা হয়। পরে কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন এক লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পাঁচ হাজার শেয়ার শওকত আলী চৌধুরীর কন্যা জারা নামরীনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই সেই শেয়ার আবার নইমুল হকের নামে স্থানান্তর করা হয়।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত আরুসা অ্যান্ড কোং শওকত আলী চৌধুরীর পরিবারের প্রত্যক্ষ মালিকানাধীন ছিল।

এ ছাড়া নইমুল হকের ৩০ জুন ২০২৫ তারিখভিত্তিক আয়কর রিটার্নের সম্পদ বিবরণীতে আরুসার মাত্র ৯৫০টি শেয়ার দেখানো হয়েছে। এসব শেয়ারের মূল্য দেখানো হয়েছে ৯৫ হাজার টাকা। কিন্তু পরিদর্শন দলের হিসাবে তাঁর প্রকৃত শেয়ার ছিল ৫ হাজার ৯৫০টি।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়কর সম্পদ বিবরণীতে নইমুল হকের শেয়ার ধারণের তথ্য গোপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সম্পদ বিবরণীতে এমন কোনো সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়নি, যার মাধ্যমে ওই বিপুলসংখ্যক শেয়ার কেনার অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল আরও দেখতে পায়, আরুসা অ্যান্ড কোং ইবিএলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ার ধারণ করলেও ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির কোনো প্রতিনিধি নেই। প্রতিষ্ঠানটি কিংবা নইমুল হক সম্পর্কে ইবিএলের কাছে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্যও সংরক্ষিত নেই বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন দলকে জানিয়েছে।

কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশনে শেয়ার কেনাবেচার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ইবিএলের শেয়ার কখনো বিক্রি করেনি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, আরুসার পোর্টফোলিওতে ইবিএল ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ারও নেই।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুনাফার উদ্দেশ্যে নয়, ‘প্রাথমিকভাবে জনাব মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর পক্ষে ইবিএলের শেয়ার ধারণের উদ্দেশ্যেই’ প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়ে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে ওই শেয়ারের ‘আল্টিমেট বেনিফিসিয়াল ওনার’ বা চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিক হিসেবে শওকত আলী চৌধুরীকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শুধু শেয়ার মালিকানা নয়, আরুসা অ্যান্ড কোংয়ের আর্থিক লেনদেনেও শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য পেয়েছে পরিদর্শন দল।

২০১৪ সালের ৩০ জুনের স্থিতিপত্রে জমি কেনার বায়না বাবদ শওকত আলী চৌধুরীকে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের স্থিতিপত্রেও ওই অর্থ অগ্রিম হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ এক দশক পরও জমিটি কোম্পানির নামে হস্তান্তর করা হয়নি এবং অর্থ আদায়ের কোনো পদক্ষেপের তথ্যও পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ জুন তাঁর মালিকানাধীন এস.এন. কর্পোরেশনকে ২৭ কোটি ২০ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

দুই খাতে মোট ৩৭ কোটি ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পেছনে পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক বা চুক্তিভিত্তিক যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই অর্থবছরে তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ন্যাশনাল টি কোম্পানিতে ১০ কোটি ৭১ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।

অন্য প্রতিষ্ঠান আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক মো. জসিম উদ্দিন। বাকি ২ শতাংশের মালিক আনিকা তাহজীব। তিনি শওকত আলী চৌধুরীর শ্যালিকা এবং ২০০৭ সাল পর্যন্ত আরুসা অ্যান্ড কোংয়ের শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক ছিলেন।

আরজেএসসিতে জমা দেওয়া ফর্ম-১১–এ আনিকা তাহজীবের ঠিকানা হিসেবে চট্টগ্রামের ২৮, সুরসন রোডের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা-সংক্রান্ত নথিতেও একই ঠিকানা পাওয়া যায়।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজের মালিকানা ও শওকত আলী চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিদর্শন দল।

তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—বিশেষ পরিদর্শনের পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ইবিএলের শেয়ার বিক্রি হয়ে যাওয়া।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজের হাতে ইবিএলের ১ দশমিক ১৪ শতাংশ শেয়ার ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চের শেয়ারহোল্ডিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির হাতে অবশিষ্ট শেয়ার মাত্র শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ।

অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় পুরো শেয়ারই বিক্রি করে দিয়েছে।

আবার গভর্নরের কাছে দেওয়া ১৯ আগস্টের আবেদনে অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম দাবি করেছেন, আরুসা অ্যান্ড কোংয়ের শেয়ারও ধারাবাহিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ইবিএল শেয়ারধারণ ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শেয়ার এরই মধ্যে হাতবদল হয়েছে।

অভিযোগকারীর ভাষ্য, যে শেয়ারের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত হয়েছে, ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই সেগুলো বিক্রি হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধার জটিল হয়ে পড়তে পারে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১–এর ২০২৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা অতিক্রমের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালে বিসিসিআই থেকে ইবিএলে রূপান্তরের সময় শওকত আলী চৌধুরী তাঁর ইকুইটির বিপরীতে শেয়ার বরাদ্দ পেয়েছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি না করে তিনি আইনের বিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।

আইনের ১৪(ক) ধারার উপধারা (৪) অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত শেয়ার এমন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করার কথা, যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের কোনো শেয়ার নেই। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি না হলে উপধারা (৫) অনুযায়ী তা সরকার বা সরকার নির্ধারিত কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যস্ত করার বিধান রয়েছে।

প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২–কে অনুরোধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

শওকত আলী চৌধুরীকে ঘিরে অভিযোগের মধ্যে আরও কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছে পরিদর্শন দল।

এর মধ্যে রয়েছে তাঁর ছেলে জারান আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন জারান অফ ডক লিমিটেডের নামে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী এ আরাফাত এবং নাফিস শারাফাতের সিডিনেট ও ফ্রন্টিয়ার্স টাওয়ার্সের শেয়ার হস্তান্তরের বিনিময়ে স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্সকে ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার অভিযোগ।

এ ছাড়া শিল্পঋণের অর্থে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মার্সিডিজ-বেঞ্জ এএমজি জি৬৩ গাড়ি ব্যক্তিগত ব্যবহারের অভিযোগ, ঋণখেলাপি মুজিবুর রহমান মিলনের সিঙ্গাপুরের ঠিকানায় শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর নামে ৩২ লাখ ডলারের সম্পদের তথ্য এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের বিষয়েও অধিকতর অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে পরিদর্শন দল।

তদন্ত শেষ হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া এবং তদন্তের তথ্য অভিযুক্ত পক্ষের কাছে ফাঁস হওয়ার অভিযোগ করেছেন অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম।

গত ১৯ আগস্ট গভর্নরের কাছে দেওয়া আবেদনে তিনি দাবি করেন, তদন্তের বিষয়বস্তু অভিযুক্ত পক্ষের কাছে পৌঁছানোর ‘সুস্পষ্ট আলামত’ রয়েছে। এর ফলে বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা শেয়ার দ্রুত বিক্রি করে ‘সুপরিকল্পিত সেইফ এক্সিট’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তাঁর অভিযোগ, এভাবে তদন্তাধীন সম্পদ বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়া তদন্তের আলামত নষ্ট এবং ভবিষ্যতে সম্পদ পুনরুদ্ধারের পথ কঠিন করে দিতে পারে।

আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বিএফআইইউ ইতিপূর্বে দুই দফায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করলেও কোনো মামলা বা চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে ওই হিসাবগুলো ‘নীরবে অবমুক্ত’ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় নির্দিষ্ট ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে। অপসারণের পর তিন বছর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ না দেওয়ার বিধানও রয়েছে।

তবে বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনের সুপারিশের পর এখন পর্যন্ত শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রকাশ্যে জানা যায়নি।

আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো, প্রক্সি শেয়ার এবং চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকানা শনাক্ত করার পরও যদি ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘসূত্রতা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাঁদের মতে, তদন্তাধীন শেয়ার দ্রুত বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও প্রয়োগক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ইবিএলের ওই শেয়ার–সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে তিনি পরিদর্শন বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কাগজে-কলমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা শেয়ার হিসাব করলে তা ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা আইনে নির্ধারিত ১০ শতাংশ সীমার মধ্যে রয়েছে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, বেনামে কারও নামে শেয়ার থাকলেও সেই ব্যক্তি ও প্রকৃত সুবিধাভোগী একই ব্যক্তি—এটি আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা করার বিষয় রয়েছে। তিনি বলেন, কেউ যদি তার গাড়িচালকের নামে শেয়ার কেনেন, তাহলে ওই গাড়িচালক ও প্রকৃতপক্ষে তিনি একই ব্যক্তি—এটি কীভাবে আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক আইনগতভাবে বেনামে থাকা শেয়ারগুলোর প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে ওই শেয়ারের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ১০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছেন—এমন অভিযোগও আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘রিপোর্টে আমরা অনেক কিছু বলতে পারি। কিন্তু রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে যখন আমি লিগ্যাল অ্যাকশনে যাব, তখন সেখানে কোনো গ্যাপ থাকা চলবে না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘যার বিরুদ্ধে আমি অভিযোগ তুলব, সে যদি আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যায়, তবে সেটা আমার দুর্বলতা যে আমি ঠিকমতো অভিযোগটা এস্টাবলিশড করতে পারিনি।’’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর