বাগেরহাট: যে বয়সে সন্তানদের কোলে মাথা রেখে শেষ জীবনের আশ্রয় খোঁজার কথা, সে বয়সে শতবর্ষী বাবার কাঁধে পঙ্গু সন্তানকে আগলে রাখার করুণ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে বাগেরহাটের মোংলায়।
উপজেলার বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নের উত্তর বিদ্যারবাহনের চেচানের কুল গ্রামের বাসিন্দা শতবর্ষী এয়াকুব আলী সরদার আর প্রায় ৯০ বছর বয়সী পাগলি বেগম। বয়সের ভারে দুজনই আজ চরমভাবে নুয়ে পড়েছেন। তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে তাদের সংসার হলেও, বুকভাঙা কষ্ট জমে আছে বড় মেয়ে আবেদা খাতুনকে (৫৪) ঘিরে। মাত্র ৭ বছর বয়সে ঘটে যাওয়া এক অভিশপ্ত দুর্ঘটনায় কোমর ভেঙে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান অবিবাহিত আবেদা। সেই থেকে টানা ৪৭টি বছর ধরে তিনি বিছানাতেই বন্দি।
জীবনপ্রদীপের শেষ প্রান্তে এসেও অসুস্থ মেয়েটিকে সামলাতে দিনরাত এক করছেন এই বৃদ্ধ বাবা-মা। কিন্তু বয়সের কাছে আজ তারা ভীষণ অসহায়। মাথা গোঁজার কুঁড়েঘরটির অবস্থাও দিন দিন বেহাল হয়ে পড়ছে। একটু বৃষ্টি নামলেই ফুটো চাল গলে পানি পড়ে ঘর ভেসে যায়, চারপাশ হয়ে ওঠে স্যাঁতসেঁতে। জরাজীর্ণ এই ঘরে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে রাত কাটানো এখন তাদের জন্য এক আতঙ্কের নাম।
আবেদার বাবা এয়াকুব আলী সরদার জানান, ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে আবেদা সবার বড়। সঠিক সময়ে উন্নত চিকিৎসা করাতে না পারায় ৪৭ বছর ধরে মেয়েকে শিশুর মতো দেখভাল করতে হচ্ছে।
মা পাগলি বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা তো একদম শেষ বয়সে চইলা আইছি, শরীলে আর ক্ষমতা নাই। ৭ বছর বয়স থেইকা মাইয়াডা বিছানায় পইড়া আছে। বৃষ্টি আইলে ঘর ভাইসা যায়। আমাগো মরার আগে মাইয়াডার থাকার মতো একটা ভালো ঘর আর চিকিৎসার ব্যবস্থা যদি হতো…।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারটির বসবাসের পরিবেশ অত্যন্ত মানবিক বিপর্যয়কর। স্যাঁতসেঁতে জরাজীর্ণ ঘরে তাদের জীবনযাপন করতে হচ্ছে। তাদের জন্য একটি নিরাপদ ঘর ও জরুরি আর্থিক সহায়তায় সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উদয় শংকর বিশ্বাস বলেন, ‘আবেদা খাতুনের পরিবারটি অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। সমাজ ও এলাকার যারা সচ্ছল মানুষ আছেন, তারা যদি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান, তবে তারা অন্তত ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। এই মুহূর্তে আবেদার জন্য একটি নিরাপদ ঘর ও আর্থিক সাহায্য খুব বেশি প্রয়োজন।’
জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা এই শতবর্ষী দম্পতির শেষ আকুতি-তাদের অনুপস্থিতিতে পঙ্গু মেয়েটি যেন অন্তত মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই পায়। সমাজের বিত্তবান ও দয়ালু মানুষের সামান্য সহযোগিতাই পারে এই জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে আলোর মুখ দেখাতে।