একেকটা টুর্নামেন্ট শেষ হচ্ছে, একেকটা সিরিজ কিন্তু বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের গল্পটা যেন বদলাচ্ছে না। কখনো ভালো শুরু, কখনো ব্যক্তিগত কিছু উজ্জ্বল পারফরম্যান্স—কিন্তু ধারাবাহিক ফলের জায়গায় বারবার হতাশা। সর্বশেষ এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায়, এরপর এশিয়ান গেমসে পদকশূণ্য বিদায়। এর মাঝেই টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব ছেড়েছেন দীর্ঘদিনের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। আর এশিয়ান গেমস শেষে কোচ সারোয়ার ইমরানের মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট এখন শুধু একটি সিরিজের বা টুর্নামেন্টের ব্যর্থতা কাটানো নিয়ে আলোচনা হওয়ার মতো জায়গায় নেই; বরং দলের নেতৃত্ব, কোচিং, ব্যাটিং এবং কাঠামোগত উন্নয়ন—সবকিছু একসঙ্গে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
এশিয়া কাপে হতাশা
সাম্প্রতিক ব্যর্থতার সবচেয়ে কাছের উদাহরণ এশিয়া কাপ। সংযুক্ত আরব আমিরাতে টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছিল দাপুটে জয়ে। ইন্দোনেশিয়াকে ৭১ রানে হারিয়ে অভিযান শুরু করে বাংলাদেশ। এরপর শ্রীলঙ্কার কাছে ৪ উইকেটে হারলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৩৪ রানে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে তারা। গ্রুপে ৩ ম্যাচে ২ জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় হয়ে শেষ চার নিশ্চিত করেছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু সেমিফাইনালে ভারতের সামনে আর প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। ভারত প্রথমে ৬ উইকেটে ১৪৯ রান করে। জবাবে বাংলাদেশ ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১০৯ রানেই থামে। ৪০ রানের হার দিয়ে শেষ হয় এশিয়া কাপের অভিযান।
ফলাফলটা একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না। টুর্নামেন্টজুড়েই বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে বড় স্কোর করার সক্ষমতা এবং চাপের সময় রান তোলার গতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বিশেষ করে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ১৫০-র কাছাকাছি বা তার বেশি লক্ষ্য তাড়া করার জায়গায় বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের সীমাবদ্ধতা অনেক আগ থেকেই স্পষ্ট।
ধারাবাহিকতার অভাব
এশিয়া কাপের আগে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি যাত্রাও খুব মসৃণ ছিল না। জুনে স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসকে নিয়ে হওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথম দুই ম্যাচেই হারে বাংলাদেশ—স্কটল্যান্ডের কাছে ৮ উইকেটে এবং নেদারল্যান্ডসের কাছে ৮ রানে। পরে স্কটল্যান্ডকে ৩৪ রানে এবং নেদারল্যান্ডসকে ১৩ রানে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেও চার ম্যাচে ২ জয় নিয়ে শেষ করে সিরিজ।

এরও আগে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার কাছে ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে হারার পর তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেও হেরেছিল বাংলাদেশ।
অর্থাৎ ব্যর্থতার গল্পটি কেবল এশিয়া কাপ কিংবা এশিয়ান গেমসে সীমাবদ্ধ নয়। মাঝেমধ্যে ভালো ফল এলেও বড় দল ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের চাপ সামলে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করার জায়গায় ঘাটতি স্পষ্ট।
বিশ্বকাপে কিছু আলো, তারপর আবার অন্ধকার
তবে পুরো ২০২৬ সালকে শুধুই ব্যর্থতার বছর বলাও ঠিক হবে না। বছরের শুরুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে মূল পর্বে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। বিশ্বকাপেও নেদারল্যান্ডস ও পাকিস্তানকে হারিয়ে নিজেদের সেরা ফলের সমান অবস্থান তৈরি করেছিল নিগার সুলতানার দল।
বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে পাঁচ ম্যাচে দুই জয় নিয়ে চতুর্থ হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই ইতিবাচক ফলকে পরের টুর্নামেন্টগুলোতে ধারাবাহিকতায় রূপ দেওয়া যায়নি। এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল এবং এরপর এশিয়ান গেমসের ফল সেই সমস্যাটাই আবার সামনে নিয়ে আসে।
এশিয়ান গেমসে পদকশূণ্য
এশিয়া কাপের ব্যর্থতার পর জাপানে এশিয়ান গেমসে ছিল আরেকটি সুযোগ। লক্ষ্য ছিল পদক, বিশেষ করে ২০২২ সালের হ্যাংজু এশিয়ান গেমসে জেতা ব্রোঞ্জ ধরে রাখা বা তার চেয়ে বড় কিছু করা। কিন্তু কোনো পদক না জিতেই দেশে ফিরতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
বৃষ্টির কারণে চীনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল পরিত্যক্ত হলে র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সেমিফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। সেখানে ভারতের বিপক্ষে ঘটে বড় বিপর্যয়। ভারত ৪ উইকেটে ১৯৫ রান করার পর মাত্র ৮১ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। ১১৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হার সোনার লড়াই থেকে ছিটকে দেয় দলকে।
ব্রোঞ্জের ম্যাচে সামনে ছিল পাকিস্তান—যাদের আগের এশিয়ান গেমসে হারিয়েই ব্রোঞ্জ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবছর বিশ্বকাপেও হারিয়েছিল যাদের। এবার সেই একই প্রতিপক্ষের কাছে ৩১ রানে হেরে পদকহীন থাকতে হয়েছে বাংলাদেশকে। পাকিস্তান ১৪৫ রান করার পর বাংলাদেশ থেমেছে ১১৪ রানে।
ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই সেই ম্যাচে প্রত্যাশিত মানের পারফরম্যান্স আসেনি। ফলে একটি পদক ধরে রাখার সুযোগও হাতছাড়া হয়েছে।
জ্যোতির বিদায়
এশিয়ান গেমস শেষ হওয়ার আগেই অবশ্য বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দীর্ঘ কয়েক বছর টি-টোয়েন্টি দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন নিগার সুলতানা জ্যোতি।
জ্যোতি ২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হওয়ার পর ৮১ ম্যাচে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে ৩২টি জয় এবং ৪৮টি হার। তার নেতৃত্বে ২০২৪ সালে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম জয়ও আসে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার ব্যাটিং ও অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ এশিয়া কাপে চার ম্যাচে জ্যোতির রান ছিল মাত্র ৫৬—ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ১০, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে ২৩ এবং ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ১৯।

জ্যোতি নিজে অবশ্য নেতৃত্ব ছাড়ার কারণ হিসেবে ব্যাটিং ও নিজের খেলায় আরও মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ নেতৃত্বের দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে নিজের পারফরম্যান্সে বেশি মনোযোগ দিতে চান তিনি। ওয়ানডে দলের নেতৃত্বে থাকার কথা অবশ্য জানিয়েছেন জ্যোতি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—টি-টোয়েন্টিতে তার উত্তরসূরি কে হবেন? এখনো পর্যন্ত নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণা করেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
কোচকে ঘিরে নতুন অস্বস্তি
মাঠের ব্যর্থতার সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে কোচিং নিয়ে বিতর্ক। এশিয়ান গেমসে পাকিস্তানের কাছে ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচ হারার পর প্রধান কোচ সারোয়ার ইমরান দলের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে কোচ ও অধিনায়ক পরিবর্তনের অনিশ্চয়তার কথা বলেন। দেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সরওয়ার বলেন, ‘কোচ আর অধিনায়ককে সাইজ করে কিভাবে ভালো ফল আশা করেন?’
তার বক্তব্যের পর বিসিবি তাকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। নারী বিভাগের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বকু জানান, একজন সিনিয়র কোচ হিসেবে এমন মন্তব্য নিয়ে বোর্ড ব্যাখ্যা চাইবে।
সারোয়ার ইমরান অবশ্য শুধু সাম্প্রতিক পরিবর্তনের কথাই বলেননি; বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও সামনে এনেছেন। তার মতে, স্কুল ক্রিকেট, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, অনূর্ধ্ব-১৮ কাঠামো এবং নারীদের জন্য আলাদা উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
বড় সমস্যা ব্যাটিংয়ে
সাম্প্রতিক ফলাফল বলছে, সমস্যাটা আরও বিষদভাবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ অনেক সময় ম্যাচে দলকে লড়াইয়ে রাখে। কিন্তু ব্যাটিংয়ে দ্রুত রান তোলার সক্ষমতা, বড় লক্ষ্য দাঁড় করানো এবং চাপের ম্যাচে রান তাড়া—এই জায়গাগুলোতে যথেষ্ট অধারাবাহিক।
এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে ১৪৯ রান তাড়া করতে গিয়ে ১০৯/৭, এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে ১৯৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৮১ অলআউট এবং ব্রোঞ্জ ম্যাচে ১৪৬ রানের লক্ষ্যে ১১৪/৭—এই তিনটি ফল বড় ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সীমাবদ্ধতার আলাদা আলাদা উদাহরণ। বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং দুর্দশা চলছে বহুদিন ধরেই।
সামনে অস্ট্রেলিয়া— বড় পরীক্ষা
নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আলাদা সময়ও খুব বেশি পাবে না বাংলাদেশ। এশিয়ান গেমস শেষ, সামনে বাংলাদেশের নারী দলের জন্য আরও কঠিন পরীক্ষা—অস্ট্রেলিয়া সফর। অক্টোবরে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ। ৯, ১১ ও ১৪ অক্টোবর তিনটি ওয়ানডে এবং ১৮, ২০ ও ২২ অক্টোবর তিনটি টি-টোয়েন্টি হবে। ওয়ানডেগুলো আইসিসি নারী ওয়ানডে চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ।
এই সিরিজের আগে দলের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসছে। টি-টোয়েন্টিতে জ্যোতির জায়গায় নতুন অধিনায়ককে দায়িত্ব নিতে হবে। একই সঙ্গে কোচিং স্টাফেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে বিসিবি অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে অভিজ্ঞ বিদেশি কোচ নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে খেলাটা সহজ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই সিরিজের গুরুত্ব শুধু জয়-পরাজয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন নেতৃত্ব, সম্ভাব্য নতুন কোচিং কাঠামো এবং সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পর দল কতটা দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারে—সেটার পরীক্ষাও হবে।

বদলটা কোথায় দরকার?
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু ‘আরও ভালো খেলতে হবে’ বললে সমস্যার সমাধান হবে না। মাঠের ফলের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, প্রতিভা খোঁজা, উচ্চমানের প্রস্তুতি, ব্যাটিংয়ের গভীরতা এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচের চাপ সামলানোর সক্ষমতা—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়তো নতুন শক্তি দিতে পারে। নতুন কোচও নতুন পরিকল্পনা আনতে পারেন। কিন্তু ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য সেই পরিবর্তনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্রিকেট কাঠামোর উন্নয়নও জরুরি।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা তৈরি করেছে। বিশ্বকাপে জয়, এশিয়া কাপে সেমিফাইনাল, এশিয়ান গেমসে নিয়মিত পদকের লড়াই—এসবই সেই অগ্রগতির প্রমাণ। কিন্তু এখন পরের ধাপে যেতে হলে বড় দলের বিপক্ষে শুধু লড়াই নয়, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জেতার অভ্যাসও তৈরি করতে হবে।
সেই যাত্রার প্রথম বড় অধ্যায় হতে পারে অস্ট্রেলিয়া সফর। নতুন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক, সম্ভাব্য নতুন কোচিং কাঠামো এবং সাম্প্রতিক ব্যর্থতার চাপ—সবকিছু নিয়েই বাংলাদেশকে সেখানে যেতে হবে।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট কি সাম্প্রতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের খেলার ধরন ও কাঠামোতে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারবে? সামনে অস্ট্রেলিয়া সফর সেই প্রশ্নের প্রথম বড় উত্তর খুঁজবে।