Sunday 04 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

হাসানুল হক ইনুর সাজা বাড়াতে চলতি সপ্তাহে আপিল

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:০০ | আপডেট: ৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:১১

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু – সংগৃহীত ফাইল ছবি

ঢাকা: জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড বাড়াতে চলতি সপ্তাহে আপিল করতে যাচ্ছে প্রসিকিউশন।

রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

তিনি বলেন, হাসানুল হক ইনু-কে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তবে প্রসিকিউশনের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাজা না হওয়ায় তা বাড়াতে আপিলের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হবে।

বিজ্ঞাপন

গত ৩০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনু-কে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। একই সঙ্গে দুটি অভিযোগে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রসিকিউশনের আনা ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগের মধ্যে ৩ নম্বর অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগেও তাকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রতিটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে পৃথক অভিযোগে দণ্ড হলেও সাজা একই সঙ্গে চলায় তাকে মোট ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়।

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একইদিন অভিযোগ আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। পরে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে ২ নভেম্বর আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

মামলায় ৩০ নভেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন দুজন।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। প্রথমে আসামিপক্ষ এবং পরে প্রসিকিউশন তাদের যুক্তি উপস্থাপন করে। ১৪ মে যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ২২ জুন রায়ের দিন নির্ধারণ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৩০ জুন রায় ঘোষণা করা হয়।

মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া ১০ জনের মধ্যে ছিলেন তিনজন চাক্ষুষ সাক্ষী, দুজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, দুজন জব্দতালিকা সাক্ষী, একজন জেলার সাক্ষী ও একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এ ছাড়া আদালতে ২০ সিরিজের নথি ও পাঁচটি বস্তু প্রদর্শন করা হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামায়াত ও সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন ইনু।

পরদিন ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকেও তিনি অংশ নেন। ওই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা কার্যকরেও তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন পুলিশ সুপারকে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মোবাইল ফোনে নির্দেশ দেন ইনু।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নির্দেশনার পর পুলিশ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র সদস্যরা কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান। এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগে আরও বলা হয়, জুলাই আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, ছত্রীসেনা মোতায়েন, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বোমা হামলা এবং আন্দোলনকারীদের আটক ও নির্যাতনের পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভিন্নভাবে নির্দেশনা ও উসকানি দেন। এ ছাড়া কারফিউ জারি করে মারণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোর বিষয়েও তিনি সমর্থন দেন বলে অভিযোগ করা হয়।

২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের আরেকটি বৈঠকে ইনু উপস্থিত ছিলেন বলেও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়। ওই বৈঠকে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জোটের সশস্ত্র সদস্যদের মাধ্যমে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে তিনি সমর্থন ও বৈধতা দেওয়ার ভূমিকা রাখেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার পতনের একদিন আগে ৪ আগস্ট কারফিউ জারি করে গুলি চালিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যাসহ তৎকালীন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ইনু অনুমোদন করেন বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের সাজা বাড়ানোর দাবিতে প্রসিকিউশনের আপিলের অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।