ঢাকা: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ইতিবাচক দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ করছে। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে অটোরিকশার লাইসেন্সিং কী হবে, কোথায় চলতে পারবে, গতি কত হবে, এর মেকানিক্যাল বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন হবে—এসব বিষয় নিশ্চিত করা হবে। এরপর সরকার ব্যবস্থা নেবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর পিআইডির সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। এগুলো পরিবেশবান্ধব, অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং নগরবাসীর পরিবহন সুবিধা বাড়াচ্ছে। তবে লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব যানবাহন চলতে পারে না।’
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গতকাল আমি গাড়ি ছাড়া বের হয়েছিলাম। রিকশার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি। অনেক অপেক্ষার পর রিকশা পেয়েছি। রাস্তায় দেখেছি অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন, হাঁটছেন। আমাদের শহরে মানুষের গণপরিবহনের অবস্থাও ভালো নয়। ফলে এসব যানবাহনের একটি সুবিধাও আছে।’
তবে এসব যানবাহনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘প্যাডেলচালিত রিকশার একটি নির্দিষ্ট গতি থাকলেও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের গতি তুলনামূলক বেশি। কিন্তু সে অনুযায়ী এসব যানবাহনের নিরাপত্তা ও যান্ত্রিক মান সবসময় নিশ্চিত করা হয় না। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতিতে অনেক জায়গায় প্রধান সড়কও এসব যানবাহনের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
‘রাজনীতির সব বিষয়ই রাজনৈতিক’
এনসিপির নেতাদের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদলসহ সব রাজনৈতিক দলেরই বিভিন্ন বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার অধিকার রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিরোধীদল সঠিক করছে কি না, সেটা নিয়ে এখন যাচ্ছি না। কিন্তু বিরোধীদল যদি কোনো বিষয়ে সবসময় তার অবস্থান না বলে, তাহলে সরকারের অন্যায় করার একটি আশঙ্কা বা ঝুঁকি থাকে। রাজনীতিতে সবকিছুই রাজনৈতিক বিষয়।’
এনসিপি যদি অটোরিকশাচালকদের দাবির পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে থাকে, সেটিও গণতন্ত্রের অংশ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে তিনি এও বলেন, ‘তারা যদি ভুল অবস্থান নিয়ে থাকে এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি মনে করে তারা ভুল অবস্থান নিয়েছে, তাহলে এর রাজনৈতিক মূল্য তাদের দিতে হবে।’
অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ চালু রাখার দাবিতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে-ই হোন না কেন, রাষ্ট্র আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’
‘রিকনসিলিয়েশনের আগে অপরাধ স্বীকার করতে হবে’
আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন বা সমঝোতার বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার মনে করে দেশে রিকনসিলিয়েশন প্রয়োজন। তবে এর একটি মৌলিক ভিত্তি থাকতে হবে ‘
তিনি বলেন, ‘রিকনসিলিয়েশনের বেসিক হচ্ছে—যে গ্রুপ, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল অপরাধ করেছে, তাদের সেই অপরাধের স্বীকৃতি থাকতে হবে। অপরাধের স্বীকৃতি এবং অনুতাপের পরই রিকনসিলিয়েশনের প্রশ্ন আসে।’
দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অপরাধের স্বীকৃতি থাকলেও সেটি ফৌজদারি অপরাধের আইনি প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেয় না।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা অবাক হয়ে দেখছি, ৫ আগস্টের পর থেকে ওই দলের প্রধান নেত্রী এখনো আমাদের ব্লেইম করছেন এবং হুমকি দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারের দিক থেকে রিকনসিলিয়েশনের আলোচনা গ্রহণ করা কঠিন।’
তবে কেউ যদি রিকনসিলিয়েশন চান, তাহলে তাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
‘চাঁদাবাজি-হামলা সরকার সহ্য করবে না’
দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ এবং এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে না। সরকারের প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো কারণও নেই। সরকারি দলের কেউ না কেউ কোনোভাবে এর সঙ্গে জড়িত—এ অভিযোগও আমি উড়িয়ে দিতে চাই না। তবে সরকার এ ধরনের কর্মকাণ্ড সহ্য করবে না।’
মিরপুরের সাম্প্রতিক ঘটনার পর সরকারের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতেই বার্তাটি খুব স্পষ্ট—সরকার এগুলো কোনোভাবেই সহ্য করবে না।’
সরকারি দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এর রাজনৈতিক দায় সরকারকেই নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যৌথবাহিনী নয়, পুলিশের ওপর আস্থা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথবাহিনীর অভিযান প্রসঙ্গে নিজের আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘তাকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি গতদিন কোনোভাবেই বলিনি যে, যৌথবাহিনী অভিযানে নামছে না। আমাকে লিডিং প্রশ্ন করা হয়েছিল—যৌথবাহিনী কি অভিযানে নামছে? আমি বলেছি, পুলিশ বাহিনী যেভাবে কাজ করছে, সেভাবেই কাজ করে যাবে।’
পুলিশের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সরকার বর্তমানে প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশের সক্ষমতা অনেকটা ফিরে এসেছে। আমরা মনে করি পরিস্থিতি ভালো দিকে যাচ্ছে। আশা করি প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার মাধ্যমেই আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারব।’
আগামী জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকার সব বিষয় মাথায় রেখেই কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।