ঢাকা: ‘মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে শিশুদের প্রকৃতি, পশুপাখি ও পরিবেশের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু পড়ালেখা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি কিংবা একাধিক ভাষা শেখাই যথেষ্ট নয়; শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। দেশের প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতিও তাদের মানবিক হতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘তোমাদের অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু পড়ালেখা শিখলে হবে না, শুধু খেলাধুলায় ভালো হলেই হবে না। শুধু আর্ট কালচারে ভালো হলেই হবে না। শুধু দু’টির বদলে তিনটি বা তিনটির বদলে চারটি ভাষা জানলেই হবে না। তোমাদের কিন্তু মানবিক হতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমাদের এই দেশের প্রকৃতি, এই দেশের পশুপাখির প্রতিও মানবিক হতে হবে। তোমরা যদি মানবিক হতে পার, হয়তো আমরা হতে পারিনি, যেমনটি হওয়া উচিত ছিল। আমরা এই বাংলাদেশকে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘শুধু মানুষের প্রতি মানুষ দয়া করবে না, মানুষকে প্রকৃতির প্রতিও দয়া দেখাতে হবে। প্রকৃতির সৃষ্টির সবকিছুর প্রতি মমত্ববোধ দেখাতে হবে।’
শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আশপাশের গাছপালা ও প্রকৃতির যত্ন নিতে হবে। কোনো গাছ যদি তাদের মতো ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, তাহলে সেটিকে পানি দেওয়া ও যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে বড় হতে সহযোগিতা করতে হবে।’
পশুপাখির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তুমি চেষ্টা কর পশুপাখির প্রতি কাইন্ড হওয়ার জন্য, তুমি চেষ্টা কর সেই পশুপাখির প্রতি দয়া দেখানোর জন্য, তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার জন্য।’
অভিভাবকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সন্তানদের মধ্যে প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করতে হবে। সবাই মিলে শিশুদের মধ্যে এই বোধ তৈরি করতে পারলে একদিন একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি প্রকৃতির প্রতি সদয় হই, অবশ্যই প্রকৃতিও আমাদের প্রতি সদয় হবে।’ প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করতে হলে প্রকৃতিকেও সহযোগিতা করতে হবে এবং প্রকৃতিকে তার নিজস্ব নিয়মে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে।
যত্রতত্র ময়লা না ফেলতে সচেতন হওয়ার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী শিশুদের প্রতি সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলার বিষয়ে তাদের সচেতন হতে হবে এবং বড়দেরও সচেতন করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জায়গায় আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বড় কেউ যদি যত্রতত্র ময়লা ফেলেন, তাহলে শিশুরা তাকে সাহস করে বলতে পারে, ‘ময়লাটি সঠিক জায়গায় ফেলুন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘পরিবেশ নষ্ট হলে আজকের শিশুরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ শিশুদের সচেতন করে তুলতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শিশুরা সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।’
‘আজ আমি বলব না, পড়ো পড়ো পড়ো’
শিশুদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আমি তোমাদের বলব না, পড়ো, পড়ো, পড়ো। আজকে আমি বলব, তোমাদের খেলাধুলা করতে হবে।’
শিশুদের বিভিন্ন প্রতিভা বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ ভালো ছবি আঁকতে পারে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, কেউ গান, গিটার, হারমোনিয়াম বা বাঁশি বাজাতে পারে। যার যে বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে, সেটি ভালোভাবে শেখার চেষ্টা করতে হবে।’
নিজের গিটার শেখার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি গিটার বাজানো শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। তাই শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি যেটা শেষ করতে পারিনি, তোমরা সেটা শেষ করো।’
তিনি বলেন, ‘শিশুদের ভেতরে থাকা গুণ ও প্রতিভাগুলো সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’
২০২৭-২৮ সাল থেকে নতুন উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও যাতে শিল্প, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সংগীতচর্চার সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যে সরকার স্কুল পর্যায় থেকে বিভিন্ন সুবিধা তৈরির চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ ২৭ বা ২৮ সাল থেকে আমরা পুরো প্রক্রিয়াটা শুরু করতে পারব।’ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি শিশু তার পছন্দের বিষয়ে শেখার সুযোগ পাবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের শিশুর ভবিষ্যৎ মজবুত হওয়া মানে জাতির ভবিষ্যৎ মজবুত হওয়া। আর জাতির ভবিষ্যৎ শক্তিশালী হলে বাংলাদেশও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শক্তিশালী দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।’
শৈশবের স্মৃতি স্মরণ প্রধানমন্ত্রীর
অনুষ্ঠানে নিজের শৈশবের স্মৃতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, শিশু একাডেমির যাত্রার শুরুর দিকে তিনি তার ছোট ভাই এবং বাবা-মা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে এখানে এসেছিলেন।
তার স্মৃতিচারণে উঠে আসে, সেদিন তিনিও শিশু হিসেবেই শিশু একাডেমির অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বর্তমান অনুষ্ঠানে এসে সেই পুরোনো স্মৃতির কথা বারবার মনে পড়ছে বলেও জানান তিনি।
শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘শিশু’ ম্যাগাজিনে নিজের ও ছোট ভাইয়ের লেখা গল্প-ছড়া প্রকাশের কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হোক: জুবাইদা রহমান
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান বলেন, ‘প্রতিটি শিশুর মধ্যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘স্নেহের ছোট বন্ধুরা, সকল বাধা-বিপত্তি ছিন্ন করে তোমরা প্রস্ফুটিত হবে, আশা-আকাঙ্ক্ষার সার্থকতার আলোকরশ্মি দুই হাতে বরণ করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি শৈশব হোক নিরাপদ, প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত—এই আমাদের কামনা।’
জুবাইদা রহমান বলেন, ‘৫০ বছর আগে শিশুদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’ শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও তিনি স্মরণ করেন।
নানা আয়োজনে শিশু অধিকার দিবস
‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সকালে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে দেড় শতাধিক শিশু তাদের বরণ করে নেয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর শিশু একাডেমির শিশুদের পরিবেশিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও জুবাইদা রহমান। এ ছাড়া, শিশুদের স্মারক উপহার প্রদান, স্মরণিকা ‘শৈশব’-এর মোড়ক উন্মোচন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে তিনি শিশুদের আঁকা ছবি ও ফটো গ্যালারি পরিদর্শন করেন। এরপর শিশু জাদুঘর ভবনে গিয়ে ভবনের নিচতলায় স্থাপিত সৌর প্যানেল ও সাবস্টেশনের উদ্বোধন করেন।
মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সচিব রওশন আরা বেগমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।