Tuesday 06 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

যে পাঠের পরীক্ষা কোনো খাতায় হয় না

সুদীপ্ত শামীম
৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:১৪

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষকদের অনেকের হাতেই কখনো চক ছিল না, সামনে ছিল না ব্ল্যাকবোর্ড, গলায় ঝোলেনি কোনো পরিচয়পত্র। তবুও তাঁরাই আমাদের জীবনের প্রথম অক্ষর, প্রথম শাসন, প্রথম সাহস আর প্রথম মূল্যবোধ শিখিয়েছেন।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে প্রিয় শিক্ষকদের নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় ছবি আর শুভেচ্ছায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিক্ষককে নিয়ে শুধু আবেগ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষকতা এখানে শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি বড় সামাজিক দায়িত্ব। আজকের শ্রেণিকক্ষেই তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের বাংলাদেশ।

আমাদের প্রথম শিক্ষক বাবা-মা। সন্তানের প্রথম শব্দ, প্রথম আচরণ, প্রথম শৃঙ্খলা, প্রথম ভালো-মন্দের ধারণা পরিবার থেকেই তৈরি হয়। মফস্বল ও গ্রামের অনেক পরিবারে সন্তানের পড়াশোনার পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগের গল্পটা আরও কঠিন। কেউ কৃষক, কেউ দিনমজুর, কেউ ছোট ব্যবসায়ী। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও সন্তানের বই, খাতা, পোশাক কিংবা পরীক্ষার ফি জোগাতে তারা নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে দেন। এরপর আসে স্কুল, মাদরাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। শহরের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে মফস্বলের শিক্ষার বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, কোথাও শ্রেণিকক্ষের অভাব, কোথাও বিজ্ঞানাগার বা লাইব্রেরির সুযোগ সীমিত। বর্ষায় কোনো কোনো এলাকার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের কাজেও হাত লাগাতে হয়।

বিজ্ঞাপন

মফস্বলের একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক অনেক সময় শুধু শিক্ষক নন। তিনি অভিভাবক, পরামর্শদাতা, কখনো সংকটে পড়া পরিবারের ভরসার মানুষ। কোনো শিক্ষার্থী কয়েকদিন স্কুলে না এলে তিনি খোঁজ নেন। জানতে পারেন, বাবার অসুস্থতায় ছেলেটি কাজে গেছে। কোনো ছাত্রী পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বসলে পরিবারকে বোঝান। কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফি জোগাড় না হলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান।

এসব গল্প হয়তো বড় শিরোনাম হয় না। কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে এমন নীরব দায়িত্ববোধের ওপর। তবে সমস্যার দিকটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষক সংকট, অনিয়মিত ক্লাস, অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ, কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা এবং পরীক্ষার ফলের অস্বাভাবিক চাপ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে দেয়। অর্থনৈতিক সামর্থ্যের কারণে যখন একই শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ আলাদা হয়ে যায়, তখন শিক্ষা আর সমান সুযোগের জায়গায় থাকে না।

সব শিক্ষককে একই চোখে দেখা অবশ্যই অন্যায়। মফস্বলের অসংখ্য শিক্ষক সীমিত সুযোগের মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় থেকেও কেউ যদি শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা অন্য কাজে বেশি মনোযোগ দেন, প্রশ্ন উঠবেই। কারণ সেই অবহেলার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীর। একজন ভালো শিক্ষক শুধু সিলেবাস শেষ করেন না। তিনি শেখান প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে, ভুল থেকে শিখতে এবং অন্য মানুষকে সম্মান করতে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের বইয়ের পাঠের পাশাপাশি তার আচরণ থেকেও শেখে। দুর্বল শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিনি কেমন ব্যবহার করছেন, দরিদ্র শিশুটিকে কীভাবে দেখছেন, ভিন্নমতকে কতটা সম্মান করছেন, নিজের ভুল হলে তা স্বীকার করছেন কি না, এসবই শ্রেণিকক্ষের নীরব শিক্ষা। আর শিক্ষক শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই থাকেন না। একজন কৃষক শেখান পরিশ্রম, একজন শ্রমজীবী মানুষ শেখান সংগ্রাম, একজন সৎ মানুষ শেখান নৈতিকতা। বন্ধুত্ব শেখায় বিশ্বাস, বিচ্ছেদ শেখায় মানুষ চেনা, আর ব্যর্থতা শেখায় নিজের ভুলের মুখোমুখি দাঁড়াতে।

তাই শিক্ষা শুধু ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট নয়। একজন মানুষ কতটা শিক্ষিত, তার বড় পরিচয় তার আচরণে। সে দুর্বলকে কীভাবে দেখে, অন্যায়ের সামনে কী করে, নিজের সুবিধার বাইরে গিয়ে অন্যের জন্য কতটা ভাবতে পারে, সেখানেই শিক্ষার আসল পরীক্ষা। বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই শুধু ফুল, শুভেচ্ছা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকার দিন নয়। এটি শিক্ষকতার মর্যাদা, শিক্ষার্থীর অধিকার এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা নিয়ে ভাবার সুযোগ।

শিক্ষকদের সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেই সম্মানের সঙ্গে দায়িত্বের কথাও বলতে হবে। শিক্ষকের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন জবাবদিহি। শিক্ষার্থীর ভালো ফল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। বিশেষ করে মফস্বলের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগের বৈষম্য কমানো জরুরি। শহরের একটি শিশু যদি উন্নত শিক্ষক, কোচিং, প্রযুক্তি ও নানা সুযোগ পায়, তবে গ্রামের কিংবা চরাঞ্চলের শিশুটি শুধু জন্মস্থান বা পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে পিছিয়ে থাকবে কেন?

একটি দেশের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য তার বড় বড় ভবন দেখার দরকার নেই। একটি মফস্বল স্কুলের শ্রেণিকক্ষে ঢুকে দেখুন, শিক্ষক কী পড়াচ্ছেন আর শিশুরা কী শিখছে। সেখানেই আগামী বাংলাদেশের একটি খসড়া লেখা হচ্ছে। তাই শিক্ষক দিবসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা শুধু কতজন ভালো শিক্ষক তৈরি করছি তা নয়, আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি। কারণ পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বর একদিন পুরোনো হয়ে যায়। সার্টিফিকেট একদিন আলমারিতে পড়ে থাকে। কিন্তু একজন শিক্ষকের শেখানো সততা, বিবেক আর মানবিকতা একজন মানুষের সঙ্গে সারাজীবন থাকে।

শিক্ষক যদি মানুষ গড়েন, সেই মানুষই একদিন দেশ গড়বে। আর শ্রেণিকক্ষে যদি মানুষ হারিয়ে যায়, তাহলে বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও শিক্ষার অর্থ হারিয়ে যাবে।

লেখক: কলামিস্ট, গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠক

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর