লিওনেল মেসি। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবলে একটা প্রজন্মকে মোহিত করে রাখার মতো একজন। একজন কিংবদন্তি, মহাতারকা, বলপায়ের একজন জাদুকর, কারও কারও মতে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির অধ্যায়টা শেষ হলো আজ। আগেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ খেলতে নেমেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি।
সেখানেও মেসির কী দাপট! বেনিনকে আজ ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা, তিন গোলেই অবদান শেষ ম্যাচ খেলতে নামা মেসির। এক গোল করেছেন, করিয়েছেন দুটি। মেসির বিদায়ে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম সেজেছিল মেসির জন্য। মেসির বিদায়ে মানুষ কেঁদেছে, অভিবাদন দিয়েছে, মেসির নামে স্লোগান দিয়েছে।
তিন গোলে জয়ের পর সেই বিদায়ের ক্ষণ যখন এলো পুরো বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে তখন শোকের ছায়া! মেসি ভেজা চোখে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলেছেন অনেক কথা। ফুটবল নিয়ে, আর্জেন্টিনাকে নিয়ে। স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া মেসির সেই বিদায়ী ভাষণ তুলে ধরা হলো-
আজ কী বলব, সত্যিই বুঝতে পারছি না। মনের ভেতর এত আবেগ, এত কিছু একসঙ্গে ঘুরছে। সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে। আমি শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। যেমনটা আমার বিদায়ী চিঠিতেও বলেছি।
২০ বছরের বেশি সময় এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য ছিল বিরাট সম্মানের। আমরা সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েও গিয়েছি। কিন্তু কখনো লড়াই থামাইনি। কখনো নিজের সর্বস্ব দেওয়া থেকে পিছিয়ে আসিনি। কখনো দলটির পাশে থাকা থেকে বিরত হইনি।
আর এখন ফিরে আসতে না পারার ভাবনাটা ভীষণ কষ্টের। সত্যি বলছি, সারা জীবন আমি এখানে ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর আর কিছু একজন ফুটবলারের জীবনে হতে পারে না। আমি চিরকাল এখানে থাকতে চাই। কিন্তু মনে হচ্ছে, বিদায় বলার এটাই সঠিক সময়।
শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য ছিল অনেক বেশি কিছু। আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। খুব কাছেও চলে গিয়েছিলাম। সত্যি বলতে, অবিশ্বাস্য কিছু ঘটেনি। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়েছিলাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা শারীরিক ও মানসিকভাবে আমাদের ভীষণভাবে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। সত্যি বলতে, কোনোমতে টিকে গিয়েছিলাম।
তারপরও আমরা লড়েছি। যেমন সব সময় লড়েছি। এই জার্সির জন্য, আমার সঙ্গে যে সতীর্থরা এতটা পথ হেঁটেছে, তাদের জন্য। একটা বিষয় নিয়ে কোনো সন্দেহ রাখবেন না। আমার পাশে যে সতীর্থই খেলেছে, এই জার্সির জন্য সে সব সময় তার সর্বস্ব দিয়েছে।
আমি আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। এই দলের সঙ্গে যে সময়টা কাটিয়েছি, সেটার জন্য। ওরাই আমাকে আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন, আমেরিকান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন, ফিনালিসিমা জেতার স্বপ্ন। আমরা যে প্রতিযোগিতাতেই খেলেছি, সেখানেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন।
মাঠে ও মাঠের বাইরে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো আমার জন্য ছিল বিশাল সম্মানের। আমি যেকোনো দলের বিপক্ষে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকতাম। কারণ জানতাম, আমার পাশে কিছু যোদ্ধা আছে, যারা নিজেদের সবটুকু দিয়ে লড়বে।
এখানে খেলাটাকে আমি ভীষণ মিস করব। আমি সৌভাগ্যবান যে পুরো দেশ ঘুরে খেলার সুযোগ পেয়েছি। আর যেখানেই গিয়েছি, পেয়েছি মানুষের অসাধারণ ভালোবাসা।
আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে, সবকিছুর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এই এতটা সময় ধরে, আমরা যেখানেই খেলতে গিয়েছি, স্টেডিয়াম ছিল পরিপূর্ণ। ম্যাচ যে ধরনেরই হোক, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা কিংবা অন্য কোনো ম্যাচ। মানুষ সব জায়গায় এসেছে। অনেক কষ্ট করে এসেছে। আমরা জানি, সেটা কতটা কঠিন।
কিন্তু তারপরও সব সময় মনে হয়েছে, আমরা যেন নিজেদের মাঠেই খেলছি। যেখানেই গিয়েছি, মানুষ আমাদের আপন করে নিয়েছে। আমরা সেটা সত্যিই অনুভব করেছি। আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি এই মাঠেই এসেছিল। বিশ্বকাপ জেতার পর আমরা যখন এখানে ফিরে খেলেছিলাম। সেদিনের অনুভূতি আমি কখনো ভুলব না।
দিনটা ছিল অসাধারণ সুন্দর।
আজও সেই দিনের ভিডিও দেখি, আর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। দিনটি চিরকাল আমার ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। থাকবে এই মানুষগুলোর ইতিহাসে। থাকবে আমার পরিবারের ইতিহাসেও। দিনটা ছিল অবিশ্বাস্য সুন্দর। তোমাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
আর আজ, আবার এই মাঠে ফিরে এসে, আমি সম্ভবত আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনটা অনুভব করছি। কারণ আজই জাতীয় দলকে বিদায় বলছি। বিদায় বলছি তোমাদের সবাইকেও।
জাতীয় দলের রং গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামাটা আমি ভীষণ মিস করব। তবে এখন থেকে আমি থাকব ওই পাশে। তোমাদের সঙ্গেই। এই ছেলেদের জন্য গলা ফাটাব। সামনে যা আসবে, তার জন্য তাদের সমর্থন করব। সব সময় একসঙ্গে থাকব।
বারবার প্রমাণ হয়েছে, আমরা যখন এক হই, একসঙ্গে দাঁড়াই, তখন আমরা যেকোনো দলের চেয়ে শক্তিশালী। যেকোনো বাধা পেরিয়ে যেতে পারি।
সামনে কঠিন সময় আসবে। নিশ্চিতভাবেই আসবে। কারণ আমরা এই সময়ে যা অর্জন করেছি, তা স্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। তাই কঠিন সময় এলে আমাদের আরও বেশি করে এই ছেলেদের পাশে থাকতে হবে।
আমি ওদের সব সময় একটা কথাই বলি। আমাদের শেষ আলোচনাতেও বলেছি। বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল তৈরি করতে হয়। কারণ এমন কিছু মানুষ আছে, যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ দেখতে চায়। আমরা তাদের সেই আনন্দ দিতে পারি না।
কঠিন সময়, খারাপ সময়ই আসলে বলে দেয় একটা দলের ভিত কতটা শক্ত। তখনই বোঝা যায় একটা দলের মধ্যে সত্যিকারের বন্ধন আছে কি না। যে দলে শক্ত বন্ধন নেই, তাদের পক্ষে বড় কিছু অর্জন করা খুব কঠিন।
আর আমি আপনাদের একটা কথা বলতে পারি, আমরা ছিলাম অসাধারণ একটা দল। আর সে কারণেই আমরা এত কিছু অর্জন করতে পেরেছি।
সত্যি বলতে, জীবনে আর কখনো এত বেশি কথা বলেছি কি না, জানি না। আমি যেতে চাই না। এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না।
শুধু আপনাদের একটা কথা বলতে চাই, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আপনাদের ভীষণ মিস করব। আর ঈশ্বরের কাছে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্টাইন। আমি আর্জেন্টাইন, এটাই আমার গর্ব।
আর আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি, সেটাও আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।
আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।