রাজবাড়ী: দুর্গাপূজা মানেই শুধু পূজার আনুষ্ঠানিকতা নয়, মণ্ডপজুড়ে থাকে শিল্প, সৃজনশীলতা ও পৌরাণিক কাহিনির নানা আয়োজন। আর সেই আয়োজনেই এবার ব্যতিক্রমী মাত্রা যোগ করেছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার ধুঞ্চি পূর্বপাড়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির। এখানে দুর্গাপূজার পাশাপাশি থাকছে শ্রীরামের অকালবোধন ও রাবণবধের থিম শো, শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে কংসবধ পর্যন্ত পৌরাণিক ঘটনাবলি নিয়ে ৫২ খণ্ডের প্রতিমা প্রদর্শনী এবং আদি যোগী শিবের মনোমুগ্ধকর আলোকসজ্জা। সব মিলিয়ে মণ্ডপটি হয়ে উঠছে পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য উপস্থাপনা।
মন্দির কমিটি সূত্রে জানা গেছে, অতীতে এ মন্দিরে ১০৮, ৮৬ ও ৫২ খণ্ডের প্রতিমা নিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও ৫২ খণ্ডের প্রতিমা সাজানো হচ্ছে। এতে প্রায় ৭০টি প্রতিমা থাকবে। পাশাপাশি বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হবে শ্রীরামের অকালবোধন থেকে রাবণবধ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা। রাম-রাবণের যুদ্ধ, দুর্গাদেবীর আরাধনা এবং যুদ্ধে শ্রীরামকে সহায়তায় হনুমানের বিভিন্ন ভূমিকা ফুটিয়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে।
ব্যতিক্রমী এ আয়োজনকে ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রায় দুই মাস ধরে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন পাঁচ থেকে সাতজন প্রতিমাশিল্পী। প্রতিমা তৈরির মাটির কাজ শেষ করে এখন চলছে রঙের কাজ। এরপর প্রতিমার সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজ সম্পন্ন করা হবে।
আয়োজকেরা জানান, মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। তবে বিশেষ আয়োজনের কারণে এ মন্দিরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে প্রচলিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত দুই দিন পর।

প্রতিমা রঙের কাজে ব্যস্ত শিল্পী।
মন্দির কমিটির সহ-সভাপতি কিশোর কুমার গুহ বলেন, ২০১৭ সাল থেকে আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে এখানে পূজা করে আসছি। এরই মধ্যে ১০৮, ৮৬ ও ৫২ খণ্ডের প্রতিমা নিয়ে পূজার আয়োজন করেছি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও ৫২ খণ্ডের আয়োজন করা হচ্ছে। এতে প্রায় ৭০টি প্রতিমা থাকবে। দুর্গাপূজার পাশাপাশি শ্রীরামের অকালবোধনের পূজা ও রাবণবধের বিশেষ আয়োজন দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ জোগাবে।
তিনি আরও বলেন, মণ্ডপের নিরাপত্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করবে। আশপাশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছেন। ফলে সবার অংশগ্রহণে এবারের পূজা উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ হবে বলে আশা করছেন তারা। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো দর্শনার্থী এ মণ্ডপ দেখতে আসবেন বলেও প্রত্যাশা তাঁর।
মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রীকান্ত কুমার বিশ্বাস রাহুল বলেন, দুর্গামায়ের পূজার পাশাপাশি এবার শ্রীরামের অকালবোধন ও রাবণবধের বিশেষ থিম শো প্রদর্শন করা হবে। এতে রাম-রাবণের যুদ্ধ, শ্রীরামের দুর্গাপূজা এবং হনুমানের বিভিন্ন রূপে আবির্ভাব ও সহযোগিতার কাহিনি তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি আদি যোগী শিব এবং শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের পৌরাণিক ঘটনাবলি ৫২ খণ্ডের প্রতিমায় উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, মূলত সনাতন ধর্মের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং দর্শনার্থীদের জ্ঞানার্জনের সুযোগ করে দিতেই এ আয়োজন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে মণ্ডপে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি পূজা উৎসব সফল করতে সব সম্প্রদায়ের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।
এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক স্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরগুলোতে স্ট্যাটিক ফোর্স মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো মন্দিরকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে জেলা প্রশাসন ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, প্রতিটি মোটরসাইকেল টহল দলে দুজন করে পুলিশ সদস্য থাকবেন। তাদের একেকটি দলকে আশপাশের ১০ থেকে ১৫টি মন্দিরের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টহল দলের পাশাপাশি রিজার্ভ স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত থাকবে। এ ছাড়া গোয়েন্দা নজরদারি ও সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর প্রতিমা, বর্ণিল থিম শো ও আলোকসজ্জায় ধুঞ্চি পূর্বপাড়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের এবারের আয়োজন দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করবে। একই সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশে উদ্যাপিত হবে শারদীয় দুর্গোৎসব।
রাজবাড়ী জেলায় মোট ৪৬১টি পূজা মন্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় (পৌরসভা সহ) ১১৮টি, গোয়ালন্দ উপজেলায় (পৌরসভাসহ) ২৬টি, বালিয়াকান্দি উপজেলায় ৫৫টি ও পাংশা উপজেলায় (পৌরসভা সহ) ১০৪টি পূজা মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।