Sunday 11 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

যশোরে এক মণ্ডপেই ১০১ প্রতিমা, পৌরাণিক কাহিনির চরিত্রে সেজেছে শ্রীহরি মন্দির

ইমরান হোসেন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১১ অক্টোবর ২০২৬ ১২:২৭ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:০৩

পৌরাণিক কাহিনির চরিত্রে সেজেছে যশোরের শ্রীহরি মন্দির।

যশোর: যশোরে এক মণ্ডপেই ১০১টি প্রতিমা। দেব-দেবীর বিচিত্র রূপ আর পৌরাণিক কাহিনির নানা চরিত্রে সাজানো হয়েছে যশোর শহরের চাঁচড়া বর্মণপাড়ার শ্রীহরি মন্দির। ব্যতিক্রমী এ আয়োজন দেখতে দর্শনার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ। অন্যদিকে, শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে জেলার আট উপজেলায় ৭৪৩টি মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ, রং ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করে উৎসবের অপেক্ষায় আয়োজকরা।

চাঁচড়া বর্মণপাড়ার শ্রীহরি মন্দিরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি প্রতিমা। প্রতিটি প্রতিমায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও পৌরাণিক কাহিনি। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই চার যুগের ধর্মীয় ও পৌরাণিক নানা উপাখ্যান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিমার শৈল্পিক রূপান্তরের মাধ্যমে। এই বিশাল আয়োজনে ঠাঁই পেয়েছে সরস্বতী, শিব, রাধা-কৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাম-সীতা, হনুমান, কপূতা রাক্ষসী, কুম্ভকর্ণ, জগদ্ধাত্রী, কালী, মনসাসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও পৌরাণিক চরিত্র।

বিজ্ঞাপন

শিল্পীদের নিপুণ হাতে মাটি, রং ও অলংকারের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী পরিবেশ। ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি প্রতিমাগুলো দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরছে পৌরাণিক কাহিনি ও ঐতিহ্যের নানা দিক।

মৃৎশিল্পীদের টানা দুই মাসের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কাঁচা মাটির কাঠামো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এসব প্রতিমা। শেষ সময়ে চলছে রঙের কাজ। চার যুগের আবহ নিয়ে তৈরি এই ব্যতিক্রমী মণ্ডপ শুধু স্থানীয়দের মধ্যেই উচ্ছ্বাস জাগায়নি, বরং শরতের শুভ্রতা, ঢাকের বাদ্য আর প্রতিমার বৈচিত্র্যে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদেরও দারুণভাবে আকৃষ্ট করবে।

মন্দির কর্তৃপক্ষের আশা, এই আয়োজন সনাতন ধর্মের নতুন প্রজন্মকে তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে সাহায্য করবে। দিনরাত পরিশ্রমে এখন উৎসবের অপেক্ষায় প্রতিমা ভাস্করেরা। যা দেখতে এরই মধ্যে দূর দূরান্ত থেকে আসছেন ভক্তরা।

দর্শনার্থী শিপ্রা বর্মন জানান, ‘আমরা প্রতিবছর অন্য এলাকায় যায় প্রতিমা দেখতে। এবার আমাদের গ্রামে এত সুন্দর একটা পুজো হচ্ছে এটা আমাদের অনেক দিনকার স্বপ্ন। ভগবান এবার আমাদের আশাটা পূর্ণ করেছে তাই আমরা অনেক খুশি।’

আরেক দর্শনার্থী দিপাঙ্কর বর্মন বলেন, ‘আমাদের বর্মণপাড়াতে ১০১টি প্রতিমার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের চার যুগ তুলে ধরা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে হিন্দু ধর্মের যুগে যুগে পরিবর্তন এটা দেখে ভালো লাগছে এবং নতুন কিছু শিখতে পারছি।’

বর্মণপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটি সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মণ বলেন, ‘সারা বিশ্বে যে একটা অশান্তি চলছে তাই আমরা শান্তির বার্তা আনার জন্য এই থিমটা তৈরি করেছি। সনাতনীদের চারটি যুগ আছে; সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি, এই যুগ অনুসারে দুষ্টদের দমন করার জন্য যুগে যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন। সেই ভাবটা আমরা এখানে প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এরই মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। অনেক দর্শনার্থী আসা শুরু করে দিয়েছে। আমরা আশা করছি এখানে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটবে।’

মন্দিরটিতে প্রতিমা ভাস্কর আকাশ মণ্ডল বলেন, ‘চার যুগের কাহিনিতে দুই মাস ধরে প্রতিমাগুলো তৈরি করেছি। রঙের কাজও শেষের দিকে। রাতদিন কাজ করছি। কিছুটা সাজসজ্জার কাজ বাকি রয়েছে। দর্শনার্থীরা দেখতে এসে যখন কাজের প্রশংসা করছেন তখন খুব ভালো লাগছে।’

শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে চাঁচড়ার এমন ব্যতিক্রম প্রতিমার আয়োজনের পাশাপাশি যশোরের আট উপজেলায় এবার ৭৪৩টি মন্দির মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বিভিন্ন মণ্ডপে এখন প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার কাজ। অনেকেই বায়না দেওয়া প্রতিমা নিতেও আসছেন।

দর্শনার্থীরা প্রতিমা দেখেতে এসেছেন।

যশোর শহরের বেজপাড়া সর্বজনীন পূজা মন্দিরের ভাস্কর শংকর মন্ডল জানান, এবার তিনি ৩৭টি প্রতিমা তৈরি করছেন। সময়মতো সরবরাহ দিতে রাত-দিন কাজ করছেন।

গত বছরের চেয়ে এবার ২৮টি বেশি মণ্ডপে আয়োজন করা হয়েছে পূজা বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন পরিষদ যশোরের সভাপতি দিপাঙ্কর দাস রতন। তিনি বলেন, ‘এবার মণ্ডপে ডিজে না বাজিয়ে ভক্তিগীতি বাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি মন্দিরের জন্য হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রীতি কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে জেলার মণ্ডপগুলোতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। শঙ্কাহীন পরিবেশে যেন নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোড়ায় এবং গমন দোলায় বা নৌকায়। সব মিলিয়ে ১০১ প্রতিমার ব্যতিক্রমী আয়োজনসহ জেলার ৭৪৩টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব ঘিরে এখন উৎসবের প্রস্তুতি। ধর্মীয় আচার, শিল্প-সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির আবহে শারদীয় দুর্গোৎসবকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত যশোরের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর