কর্মজীবন মানেই নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে কাজ করার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সকালের মিষ্টি রোদ আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফির পেয়ালা দিয়ে অফিস শুরু হলেও দিন গড়ায় নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। কাজের চাপ, ডেডলাইনের তাড়া আর লক্ষ্য অর্জনের ইঁদুর দৌড়ে সহকর্মীদের মাঝে অনেক সময় মানসিক চাপ তৈরি হয়। আর ঠিক এই বাস্তবতাকে একটু হালকা মেজাজে এবং রসিকতার মোড়কে তুলে ধরতে প্রতি বছর ২৭ অক্টোবর পালিত হয় ‘খিটখিটে সহকর্মী দিবস’। দিনটি যেমন মজার, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে আছে সহকর্মীদের মানসিক অবস্থা বোঝার এক গভীর তাৎপর্য।
অফিসের চেনা মুখ ও একটুখানি রুক্ষ মেজাজ
প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই এমন দু-একজন সহকর্মী থাকেন, যাদের কাছে সকালের শুভেচ্ছা জানানোটাও অনেক সময় সাহসিকতার কাজ বলে মনে হয়। কোনো ফাইল জমা দিতে গেলে ভ্রু কুঁচকে তাকানো, কাজের সামান্য ত্রুটিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলা কিংবা ছোটখাটো বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ করা তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। কেউ হয়তো জোরে টাইপ করেন, কেউ আবার কথা বলার সময় কথায় কথায় বিরক্তিবোধ প্রকাশ করেন। তবে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই খিটখিটে আচরণের পেছনে সাধারণত ব্যক্তিগত বিরক্তি বা কাজের অতিরিক্ত চাপ কাজ করে। খিটখিটে সহকর্মী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই রুক্ষ মানুষগুলোর ভেতরেও একজন রক্ত-মাংসের ক্লান্ত মানুষ লুকিয়ে আছে।
কেন উদ্ভূত হয় এমন মেজাজ
কর্মক্ষেত্রে মানুষের খিটখিটে হয়ে ওঠার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত কারণ রয়েছে। একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্যের ঘাটতি মানুষকে সহজেই খিটখিটে করে তোলে। অনেক সময় সহকর্মীদের নিজেদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি বা কাজের অনুপযুক্ত পরিবেশও মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী থাকে। যখন কারো মনের ভেতর হতাশা বা কাজের চাপ জমতে থাকে, তখন তুচ্ছ কোনো বিষয়েও তার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এই দিনটি আমাদের সেই কারণগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় এবং একটু সহানুভূতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে।
দিবসটি উদযাপনের পেছনের সূচনা
দিবসটির সূচনা ও ইতিহাস এই মজার ও অনানুষ্ঠানিক দিবসটির সূচনা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ছুটির দিন ও বিভিন্ন অদ্ভুত উৎসবের প্রবক্তা থমাস রয় এবং রুথ রয় দম্পতি (WellCat Holidays)। কর্মক্ষেত্রের একঘেয়েমি দূর করতে এবং সহকর্মীদের নানান মনস্তাত্ত্বিক দিককে একটু হাসিখুরির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে তারা বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যতিক্রমী দিবসের প্রচলন করেছিলেন, যার মধ্যে খিটখিটে সহকর্মী দিবস অন্যতম। মূলত কর্মজীবীদের দৈনন্দিন কাজের চাপ আর সহকর্মীদের ভিন্নধর্মী মেজাজকে হালকাভাবে উপভোগ করার জন্যই এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
কেন পালন করা হয়
অফিস বা কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন শত ব্যস্ততা আর নানা ধরনের মানুষের সাথে কাজ করতে হয়। মানুষের মেজাজ বা মনস্তত্ত্ব প্রতিদিন এক রকম থাকে না। কাজের অতিরিক্ত চাপ, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা কিংবা ক্লান্তির কারণে অনেক সময় সহকর্মীরা একটু খিটখিটে বা বিরক্তিভাব প্রকাশ করে ফেলেন। এই দিবসটি পালনের মাধ্যমে মূলত স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, মানুষের খারাপ মেজাজ বা বিরক্তি একটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। সব সময় সবাইকে জোর করে হাসিখুশি থাকতে হবে বা পারফেক্ট হতে হবে—এমন অদৃশ্য চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এই দিনটির জুড়ি নেই।
সহকর্মীর খিটখিটে ভাব সামলানোর কৌশল
অফিসে কোনো সহকর্মী যখন খিটখিটে মেজাজে থাকেন, তখন তার সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে আচরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। তার রাগের মুখে রাগ না দেখিয়ে বরং শান্ত থাকা পরিস্থিতিকে সহজ করতে সাহায্য করে। অনেক সময় একটু হাসিমুখ বা কাজের ক্ষেত্রে ছোট্ট সহযোগিতাও সেই ক্ষণস্থায়ী বিরক্তি দূর করতে জাদুর মতো কাজ করে। যদি কোনো সহকর্মী অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকেন, তবে তাকে কিছুটা সময় দেওয়া বা তার কাজের বোঝা কিছুটা হালকা করার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। সহানুভূতির এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো অফিসের সামগ্রিক পরিবেশকে অনেক বেশি সুন্দর ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
খিটখিটে সহকর্মীকে নিয়ে আজ কাটুক সুন্দর সময়
খিটখিটে সহকর্মী দিবস কোনো কাউকে উপহাস করার জন্য নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্যময় মানসিকতাকে মেনে নেওয়ার একটি সুন্দর উপলক্ষ। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই নিখুঁত নই এবং একেক জনের মানসিক সহ্যক্ষমতা একেক রকম। সহকর্মীদের এই খিটখিটে স্বভাবগুলোকে একটু হাসিমুখে মেনে নিয়ে এবং তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে একটি চমৎকার কর্মপরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। দিন শেষে একটি ইতিবাচক ও হাসিখুশি অফিসই কেবল কাজের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে না, বরং সহকর্মীদের মধ্যকার সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করে তোলে।