বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতা বাড়ানো, আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসব খাতে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দুই দেশের সরকারপ্রধান।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদন শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করতে তার সরকার কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার ও দেশটির বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য জাপানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তারেক রহমান।
বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
প্রস্তাবিত টেক পার্কের মাধ্যমে জাপানের কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ মেধা, উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ছয় বিভাগীয় শহর যুক্ত হবে দ্রুতগতির রেলে
বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন তারেক রহমান। এসব বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।
জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা কামনা
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত।
এ ছাড়া, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান। একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠকে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত চিহ্নিত করা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সহযোগিতার সুযোগগুলোকে কার্যকর উদ্যোগে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।