রংপুর: রংপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের জরুরি সংস্কারকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের বিরুদ্ধে। সফরের আগে চার দিনে যে সংস্কারকাজ করা হয়, সাত দিনের মধ্যেই নতুন বসানো সিমেন্ট ব্লক ভেঙে গুঁড়া হয়ে গেছে এবং পিচের প্রলেপ উঠে ফের খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। একই অংশে এখন আবার সংস্কারকাজ চলছে।
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটারে এই চিত্র দেখা গেছে। গত ২০ অক্টোবর শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর রংপুর সফরের আগে পুরোনো ইটের পাটাতন তুলে নতুন সিমেন্টের ব্লক বসিয়ে তার ওপর পিচের প্রলেপ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বিমানযোগে সৈয়দপুর হয়ে রংপুরে এসে মন্দির পরিদর্শন ও সনাতন সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় করেন । এরপর তিনি সড়কপথে পুনরায় সৈয়দপুর বিমানবন্দর হয়ে রাজশাহীর কর্মসূচিতে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা, চালক ও পথচারীরা সংস্কারের সময়ই কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, সংস্কার করা কয়েকটি অংশে নতুন বসানো ব্লক ভেঙে গেছে এবং কোথাও পিচের প্রলেপ উঠে আগের মতো গর্ত তৈরি হয়েছে। সেসব জায়গায় আবারও মেরামতের কাজ চলছে। ফলে একই সড়কের একই অংশে অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার সংস্কার করতে হচ্ছে।
সিও বাজার এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হক বলেন, ‘এখানে সড়ক সংস্কার করা হয় আবার নষ্ট হওয়ার জন্য। যাতে সারা বছর মেরামতের কাজ চলে, কর্মকর্তা আর ঠিকাদারদের কামাই ভালো থাকে।” হাজীপাড়া মোড়ের ব্যবসায়ী রাকিব ইসলাম বলেন, “সাত দিন আগেই সড়কের এই অংশের ইটের পাটাতন তুলে সিমেন্টের ব্লক বসানো হয়েছিল। নিম্নমানের কাজের কারণে সেগুলো ভেঙে গুঁড়া হয়ে গেছে।’
একই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী বাসচালক আব্দুর রশিদের অভিযোগ, ‘দুই নম্বরি কাজ করলে তো বারবার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত সড়কের খুবই খারাপ অবস্থা। এই অংশে দুর্ঘটনাও ঘটে।’
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষ্যে নামমাত্র সংস্কার করা অংশটি ফের খানাখন্দে ভরে গেছে বলে সরেজমিনে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফিজার রহমানের অভিযোগ, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা খরচ দেখানো হলেও দুই দিনেই সড়ক ভেঙে গেছে। সওজের প্রকৌশলীরা লোক দেখানো কাজ করে পুরো টাকা ভাগবাঁটোয়ারা করে আত্মসাৎ করেছেন। এখন আবার নতুন করে সংস্কারের নামে বরাদ্দের টাকা লুটের পাঁয়তারা চলছে।’ পাগলাপীর থেকে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে যাতায়াতকারী এনজিও কর্মকর্তা বদরুল হাসান প্রশ্ন তোলেন, কেন কোনো নিয়ম বা টেন্ডার ছাড়াই নিজেদের মরজিমাফিক এ কাজ করা হলো।
সওজের মাঠকর্মী সালাম ও আবুল হোসেনের ভাষ্য, নামমাত্র খোয়া ও বালু দিয়ে খানাখন্দ ভরার চেষ্টা করা হলেও মূলত কোনো স্থায়ী কাজই হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সওজের এক প্রকৌশলীও স্বীকার করেছেন যে সড়ক সংস্কারের নামে আসলে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রংপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কামাল পাশা বলেন, ‘কাজ করতেছি, উঠে যাচ্ছে। বারবার সংস্কার করছি, উঠে যাচ্ছে। ইট ভেঙে যাচ্ছে, ইট তুলে ব্লক দিচ্ছি সেটিও ভেঙে যাচ্ছে। এত লোডেড গাড়ি চলার কারণে এমন হচ্ছে। এ সড়কের নিচের ফাউন্ডেশন খারাপ, তাই কোনোটাতে টিকতেছে না। এটা নতুন করে নির্মাণ ছাড়া কোনো বুদ্ধি নাই।’
তিনি জানান, সড়ক সংস্কারের জন্য কোনো টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি, তবে রক্ষণাবেক্ষণ বা ‘মেইনটেন্যান্স’ খাতের অর্থ দিয়ে কাজটি করা হয়েছে। এ খাতে ঠিক কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বলতে রাজি হননি।
এদিকে এই মহাসড়কে আগেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সওজ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের ১৭ কিলোমিটার সংস্কারের কাজ ২৬ কোটি ৮৯ লাখ ৫৯ হাজার ৯৪৬ টাকায় পায় রাজশাহীর ডন এন্টারপ্রাইজ। ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশে ডিবিএসটি পদ্ধতিতে সংস্কারকাজ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, টহলরত সেনাবাহিনীর একটি দল সড়কের প্রতি বর্গমিটারে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ৫ কেজি পাথর কম ব্যবহারের বিষয়টি শনাক্ত করে । এতে প্রায় ৩৬৫ টন পাথর কম ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের কার্পেটিং উঠে বিভিন্ন স্থানে গর্ত তৈরি হয়।
সরকারি অর্থ লোপাট ও নিম্নমানের কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা।