রংপুর: রংপুরে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্প প্লটের তীব্র সংকট। বিদ্যমান বিসিক শিল্পনগরীর ৮৩টি প্লটের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ একটি প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকায় নতুন উদ্যোক্তারা জমি পাচ্ছেন না। ফলে কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা, কমছে কৃষি জমি এবং বাড়ছে বেকারত্ব। ২০০২ সাল থেকে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
রংপুর বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৭ সালে নগরীর সিও বাজার এলাকায় ২০ দশমিক ৬৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে ৮৩টি প্লটে বিভক্ত করে উদ্যোক্তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে এখানে রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আরএফএল), জিএফএল, খান ফাউন্ড্রি, চৌধুরী আইস অ্যান্ড কোল্ডস্টোরেজ, বিসমিল্লাহ মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, নাইন জুট মিলস, হিমাদ্রি কোল্ড স্টোরেজ, মিল্ক ভিটাসহ ২৫টি শিল্প ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি সচল। তবে প্লটের আকারভেদে এ ক্যাটাগরিতে ১৩টি, বি ক্যাটাগরিতে ৩৯টি, সি ক্যাটাগরিতে ১৬টি, ডি ক্যাটাগরিতে ১৪টি এবং একটি বিশেষ প্লট থাকলেও এর প্রায় ৭৫ শতাংশই আরএফএলের দখলে।
এদিকে ২০১০ সালে রংপুর বিভাগ গঠনের পর উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি বিসিকের প্লট সংখ্যা। ফলে প্রতিদিনই নতুন উদ্যোক্তারা প্লটের আশায় বিসিক এলাকায় এসে ফিরে যাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উদ্যোক্তা জানান, প্লট না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে কৃষি জমি কিনে শিল্প স্থাপন করছেন, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

দ্বিতীয় শিল্পনগরীর ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
২০০২ সালে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৪ সালে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে দমদমায় প্রায় ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক সদর উপজেলার হরিদেবপুর ও রামনাথপুর মৌজার ১০০ একর জমির সম্ভাব্য মূল্য ও স্কেচ ম্যাপসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠান। কিন্তু ওই আবেদনও ফাইলবন্দি হয়ে ঝুলে আছে।
রংপুর বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক এহেছানুল হক বলেন, ‘দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরীর জমির জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠায় আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।’
বিদ্যমান শিল্পনগরীর অবকাঠামো সংকট
প্রথম বিসিক শিল্পনগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো খানাখন্দে ভর্তি। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু সমান জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। নেই কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট। ফলে শিল্প ইউনিটগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে নিজ উদ্যোগে বর্জ্য অপসারণ করতে হচ্ছে, যা কারখানা পরিচালনার ব্যয় বাড়াচ্ছে। এছাড়া নিরাপত্তার অভাব ও অনুন্নত অবকাঠামো ব্যবসার অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে উদ্যোক্তারা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
উদ্যোক্তাদের দাবি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পোদ্যোক্তা আবদুল মতিন বলেন, নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপিত হলে বেকার সমস্যার সমাধান সম্ভব। বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তা সামসী আরা জামান কলি দ্রুত দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তুলে নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে জমি বরাদ্দের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এতে পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলে নারীদের কর্মসংস্থানের পথ আরও সহজ হবে।

উদ্যোক্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘বিসিকে সহজ শর্তে ঋণ, প্লট এবং ভালো সড়ক যোগাযোগ পাওয়া যায়। নতুন বিসিক হলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স ও অনুমতিপত্রও সহজে মিলবে। রংপুর থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন রয়েছে, তাই দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরীতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।’
রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট গোলাম জাকারিয়া পিন্টু বলেন, “বর্তমান বিসিক শিল্পনগরী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সেখানে নতুন উদ্যোক্তারা সুযোগ পাচ্ছেন না। এ কারণেই দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী তৈরি করা প্রয়োজন।”
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এমদাদ হোসেন বলেন, ‘বিসিক শিল্পনগরীতে জায়গা না থাকায় রংপুরে যত্রতত্র ও কৃষি জমিতে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। ফলে দিন দিন কমছে কৃষি জমি, যা খাদ্য উৎপাদনকে হুমকিতে ফেলছে। তাই দ্রুত দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।’
অর্থনীতি বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজুর মতে, রংপুর বিভাগে শিল্পায়নের বন্ধ্যাত্ব দূর করতে হলে কেবল বিসিক শিল্পনগরী নয়, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও গ্যাস সংযোগসহ একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হাব গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় উত্তরাঞ্চলের শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত বেকারদের ঢাকামুখী স্থানান্তর অব্যাহত থাকবে এবং কৃষিজমি কমে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।