ঢাকা: রাজধানীর পুরানা পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকা। হাতে লগি-বৈঠা, লাঠি ও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। মুহুর্মুহু ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ, গুলির শব্দ আর রক্তাক্ত রাজপথ। এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পড়ে থাকে নিথর দেহ। সেই দেহ ঘিরে উল্লাসের দৃশ্যও ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এভাবেই স্মরণীয় হয়ে আছে ‘লগি-বৈঠার সংঘাত’ নামে।
ঘটনার পর কেটে গেছে দুই দশক। সরকার বদলেছে, পালটেছে রাজনৈতিক সমীকরণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন থেকে শুরু করে বহু নাটকীয় অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে দেশ। কিন্তু ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা, প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা, দায়ীদের জবাবদিহি এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঘটনাটির ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। দিনটি ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও বিচারের দাবি আবারও সামনে এসেছে। পুরোনো সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি নতুন করে আলোচনায় এনেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা, প্রতিপক্ষের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং বিচারহীনতার প্রশ্ন।
যে রাজনৈতিক সংকট থেকে সংঘাত
২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন কি না, তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট আন্দোলনে নামে।
একই সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছিল। সংকট নিরসনে দুই দলের তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে সংলাপ হলেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।
২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টন ও আশপাশের এলাকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী পৃথক সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে, বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এবং জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ করতে চেয়েছিল। সংঘর্ষের আশঙ্কায় পুলিশ পল্টন ময়দান ও আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।
তবে নিষেধাজ্ঞা উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারেনি। সকাল থেকেই বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট, পল্টন ও তোপখানা এলাকায় বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। পরে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়।
বিবিসি বাংলার ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পল্টন এলাকায় এক ব্যক্তিকে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটানোর ঘটনা ঘটে। পরে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, নিহত ব্যক্তির নাম মুজাহিদুল ইসলাম মুজাহিদ; তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের একটি স্থানীয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
ঘটনার বিভিন্ন ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহের পাশে কয়েকজনের উল্লাসের দৃশ্যও আলোচনায় আসে। এসব ছবি ও বিবরণ ২৮ অক্টোবরের সহিংসতাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত করে।
প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
২৮ অক্টোবরের সংঘর্ষে ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে।
ঘটনার দিন প্রকাশিত একটি প্রথম শ্রেণির অনলাইনের প্রতিবেদনে পল্টন এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা বলা হয়। বিবিসি বাংলার পরবর্তী বিশ্লেষণে পল্টন এলাকার সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও দলটির সমর্থক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ছয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত তথ্য এক নয়। তবে রাজনৈতিক সংঘর্ষে একাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
২৮ অক্টোবরের আগের দিন ও পরের দিনও দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বাইরেও রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ হতাহত হন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি দিনের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার অংশ হয়ে ওঠে।
মামলা, চার্জশিট ও প্রত্যাহার
ঘটনার পরদিন পল্টন থানায় হত্যা মামলা দায়েরের তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মামলায় আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের একাধিক নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালের এপ্রিলে ৪৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে মামলার পরবর্তী গতিপথ বদলে যায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জুলাইয়ে মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানানো হয় এবং ওই বছরের ১৭ আগস্ট আদালত প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করেন।
মামলা প্রত্যাহারের ফলে ২৮ অক্টোবরের সহিংসতায় দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহির প্রশ্ন রাজনৈতিক বিতর্কে বারবার ফিরে এসেছে। তবে মামলা প্রত্যাহার, অভিযোগপত্র এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখা জরুরি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
দুই দশক পরও বিচার দাবি
২৮ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। দলটির নেতাদের বক্তব্য, লগি-বৈঠা নিয়ে সংঘটিত হামলা ও হত্যার ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৭ অক্টোবর ঢাকায় আলোচনা সভা এবং ২৮ অক্টোবর দেশব্যাপী প্রতিবাদ, আলোচনা ও দোয়া অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। দলটির বক্তব্য, দীর্ঘ সময় পার হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি।
রাজনীতিতে সহিংসতার পুরোনো ক্ষত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা নতুন নয়। তবে ২৮ অক্টোবরের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ সেদিনের সংঘর্ষের ছবি, রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ এবং প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু মতপার্থক্য যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় কারা কী ভূমিকা রেখেছিলেন, কোথায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা ছিল এবং হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলোর কী বিচারিক নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নির্ভরযোগ্য নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং আদালতের রেকর্ডের প্রয়োজন।
ইতিহাসের শিক্ষা কোথায়
দুই দশক পর ২৮ অক্টোবর শুধু একটি রাজনৈতিক দলের স্মরণ বা প্রতিবাদের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও আত্মসমালোচনার উপলক্ষ। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিপক্ষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যেকোনো রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতদের পরিচয়, ঘটনার প্রকৃত বিবরণ এবং দায় নির্ধারণের প্রশ্ন দলীয় বয়ানের বাইরে গিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
২৮ অক্টোবরের রক্তাক্ত স্মৃতি তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে— রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে মানুষের জীবন কি বারবারই সবচেয়ে কম মূল্য পাবে, নাকি অতীতের সহিংসতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ এমন রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে হত্যা বা আক্রমণ করার সংস্কৃতি থাকবে না?