Sunday 01 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন / সাড়ে ১৩ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৪৬

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১ নভেম্বর ২০২৬ ১৯:৫০ | আপডেট: ১ নভেম্বর ২০২৬ ১৯:৫১

গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত আজকের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: দেশে গত ১৩ বছর ৮ মাসে (২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট) দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৭৪৬ জন নিহত এবং ৪৬ হাজার ৩৫১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে ৪২৮ জন নিহত ও ২৭ হাজার ৮৬০ জন আহত হয়েছেন এবং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘর্ষের ঘটনায় ৩১৮ জন নিহত ও ১৮ হাজার ৪৯১ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসনের প্রতিটি নির্দেশকে তথা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা, অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি, অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। এ প্রেক্ষিতে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। আর এই সংস্কারের দায়-দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে সংস্থাটির এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফলে এ তথ্য উঠে আসে। গুণগত এই গবেষণার আওতায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের (৩৭টি নিবন্ধিত ও ৫টি অনিবন্ধিত) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ৩২টি দল তথ্য প্রদান করেছে। এই গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্যের সময়সীমা ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। তবে ক্ষেত্রবিশেষে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য-উপাত্তও ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের আইনি শর্তভিত্তিক যে ব্যবস্থাটি রয়েছে, তা প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতা (কম্পিটেটিভ ক্লায়েন্টিলিজম) তৈরি করে, যা দলগুলোকে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য করে। দলীয় কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা, অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির ফলে দলগুলোর মধ্যে এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্বপরায়ণতা, অভিজাততন্ত্র, গরিষ্ঠতন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ১০টি রাজনৈতিক দলে পরিবারকেন্দ্রিক দলীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয় বিদ্যমান রয়েছে।

গবেষণায় আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতায় দেখা গেছে আরপিও, ১৯৭২ অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র থাকা এবং সেই গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ, সাতটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধারা ৯০খ এ, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে শিক্ষক বা ছাত্র এবং আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কর্মচারী বা শ্রমিক বা অন্য কোনো পেশার সদস্যদের নিয়ে গঠিত সহযোগী বা অঙ্গ সংগঠন না রাখা কথা বলা আছে। অথচ সংগঠনের গঠনতন্ত্রে উল্লেখ না থাকলেও প্রায় সকল দল বিশেষত বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ‘‘সহযোগী’’ বা ‘‘ভ্রাতৃপ্রতিম’’ সংগঠন নামে ছাত্র ও পেশাজীবী সংগঠন পরিচালনা করা হয়। এছাড়া, নতুন দলের নিবন্ধন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থ ও পেশিশক্তির জোরে এবং রাজনৈতিক প্রভাবে অনেকক্ষেত্রে দল প্রতিষ্ঠা ও সহজে নিবন্ধন প্রাপ্তির ঘটনা ঘটছে। কয়েকটি নতুন দলকে নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ বা রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে ন্যূনতম ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় ও কার্যক্রম পরিচালনা করলে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের বছরে ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, অথচ তাদের ঘোষিত আয়ের উৎস (সদস্য চাঁদা) থেকে সর্বোচ্চ আয়ের পরিমাণ মাত্র ২৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে, সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত কার্যক্রম বিস্তৃত থাকলে ব্যয় দাঁড়াবে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা, যেখানে সদস্য-চাঁদা বাবদ আয় দাঁড়াবে ১৪ থেকে ৩৮ কোটি টাকা। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত শাখা বিস্তৃত থাকলে বছরে ব্যয় হয় ১৫৩২ থেকে ২১৮৮ কোটি টাকা, অথচ সদস্য চাঁদা বাবদ আয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১১৬ কোটি টাকা। আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো দলের আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালী বিধি নেই। দলসমূহের গঠনতন্ত্রে আয়-ব্যয়, দলীয় সদস্যদের পদভেদে চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, মনোনয়ন ফর্ম ফি, হিসাব সংরক্ষণ, আর্থিক লেনদেন, ক্রয়, নিরীক্ষা, আর্থিক জবাবদিহি ইত্যাদি সম্পর্কিত নির্দেশনা অস্পষ্ট। দলসমূহ বাৎসরিক বাজেট প্রণয়ন করে না। রাজনৈতিক দলগুলোর জমাকৃত বার্ষিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন দলের বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ করাও হয় না।

১২টি দলের প্রধানের ১০ বছর বা তার অধিক সময় ধরে দলীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ এবং একটি দলের (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) কমিটি গঠনপ্রক্রিয়া দলীয় গঠনতন্ত্রে উল্লেখ নেই। দলগুলোর গঠনতন্ত্রে অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তগ্রহণে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করা হলেও অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া মূলত ব্যক্তিনির্ভর।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে বা অন্য যেকোনো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রাজনৈতিক দল। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় যতটুকু অর্জন হয়েছে, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর, তবে সম্ভাবনা সত্ত্বেও, যা অর্জিত হয়নি তার দায়ভারও তাদেরকেই নিতে হবে। দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থার মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। দলগুলোতে সংবিধান এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান পরিপালন না করার প্রবণতা লক্ষণীয়। একইসঙ্গে, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ অতিমাত্রায় অর্থনিভর্র হওয়ায় দলগুলো ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নিভর্রশীল হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক অর্থায়নের এই ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিকতার ফলে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে, যা রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতা-কেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে পরিণত করছে।

রাজনৈতিক দলে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলীয় কার্যক্রমে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা ও অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তব কোনো অগ্রগতি দেখা যায়না এবং নারী নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্তিতে অনিহা বা প্রতীকী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা ও তৃণমূলের অংশগ্রহণের ঘাটতির ফলে দলগুলোতে একচ্ছত্র বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্বপরায়ণতা, অভিজাততন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিকতা ক্রমাগত গভীরতর হচ্ছে।

দলের নেতা ও কর্মীদের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রেক্ষিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এডহক-ভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অভ্যন্তরীন জবাবদিহির ঘাটতির ফলে বৃহৎ দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ও অন্তর্দ্বন্ধ স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। তবে এই সংস্কারের দায়-দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং জনগণের আস্থা অর্জনের পূর্বশর্ত হিসেবে দলগুলোকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মৌলিক সংস্কারের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে গবেষণা প্রতিবেদনে ১২ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ এর প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে; রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ -এর আওতায় নিয়ে আসতে হবে; নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক হিসাব যাচাই ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তদারকি বৃদ্ধি এবং আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রেজিস্টার্ড চার্টার্ড একাউন্টিং ফার্মের একটি তালিকা তৈরি এবং তালিকাভুক্ত ফার্মের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক লেনদেনের নিরীক্ষা সম্পাদন নিশ্চিত করতে হবে; দলের গঠনতন্ত্রে কমিটি গঠন ও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ভিত্তিক কাউন্সিল আয়োজন এবং প্রতিটি পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্বাচন গোপন ভোটের মাধ্যমে করতে হবে; দলীয় প্রধানের পদসহ নেতৃত্বস্থানীয় পদে একই ব্যক্তি কতদিন দায়িত্ব পালন করতে পারবে তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে; দলের নেতৃত্ব পর্যায়ে ও নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদানে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান। এসময় প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওসার আহমেদ, কাজী আমিনুল হাসান ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন।

সারাবাংলা/এমএইচ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর