Tuesday 03 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি / বাংলা গদ্যের পথপ্রদর্শক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী

সারাবাংলা ডেস্ক
৩ নভেম্বর ২০২৬ ১১:২৫ | আপডেট: ৩ নভেম্বর ২০২৬ ১৩:০৩

এয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠ পাংশা, রাজবাড়ী। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে তাকে ধারণ করার মতো মানুষ খুব কমই আছে। আজকে আমরা যখন স্বাধীন ও আধুনিক বাংলায় মুক্তবুদ্ধি চর্চা করার চেষ্টা করছি, তার সুদূরপ্রসারী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অগ্রপথিকেরা। সমাজের কূপমণ্ডূকতা ভেঙে ভাষা ও সংস্কৃতির টানে তারা যে পথ দেখিয়ে গেছেন, তা বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরকাল প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিশ শতকের প্রথমাংশে বাঙালি মুসলমান সমাজের আত্মপরিচয় অন্বেষণ, মননচর্চা এবং সাহিত্যিক জাগরণের ইতিহাসে যে কটি প্রতিষ্ঠান আলোকবর্তিকা হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছিল, তার মধ্যে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ অন্যতম। ১৯১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতার বুদ্ধিজীবী ও তরুণ সাহিত্যিকদের উদ্যোগে গঠিত এই সমিতি কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ছিল না; এটি ছিল একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠীর আত্মবিকাশ ও মুক্তির সোপান। আর এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের রূপকার ও চালিকাশক্তিগুলোর অগ্রভাগে ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক—মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

তৎকালীন সমাজবাস্তবতা ছিল ঘোর অন্ধকারের চাদরে মোড়া। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং সামন্ততান্ত্রিক শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট বাঙালি মুসলমান সমাজ তখন আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রগতিশীল চিন্তা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছিল। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁড়ে বসেছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং কূপমণ্ডূকতা। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে কলকাতার মফস্বল থেকে শুরু করে শহুরে শিক্ষিত যুবসমাজকে একত্রিত করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন এয়াকুব আলী চৌধুরীসহ সমমনা দূরদর্শী মানুষেরা।

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা, নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে ব্রতী হওয়া এবং মাতৃভাষার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করা। অথচ সেকালে আত্মপরিচয়ের এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি কাজ করছিল সমাজের একটি প্রভাবশালী মহলে। উচ্চবিত্তের অনুকরণে বা ভুল ধারণাবশত কেউ কেউ আরবি-ফার্সির পাশাপাশি ‘উর্দু’কে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার অলীক তর্কে লিপ্ত ছিলেন। সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এয়াকুব আলী চৌধুরী অত্যন্ত সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে মাতৃভাষার পক্ষে নেওয়া এই আপসহীন অবস্থান তৎকালীন সমাজে এক যুগান্তকারী বুদ্ধিবৃত্তিক মোড় পরিবর্তন ছিল।

সমিতির কার্যক্রম কেবল সভা-সেমিনার বা আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ (১৯১৮) এবং পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত মাসিক ‘সাহিত্যিক’ (যা এয়াকুব আলী চৌধুরী ও কবি গোলাম মোস্তফার যুগ্ম সম্পাদনায় এক বছর প্রকাশিত হয়) সেকালের উদীয়মান মুসলিম লেখকদের মুক্তচিন্তা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। এয়াকুব আলী চৌধুরী এই সমিতির সম্পাদক হিসেবে নিভৃতচারী ও প্রান্তিক লেখকদের মূলধারার সাহিত্যচর্চায় যুক্ত করতে নিরলস পরিশ্রম করেছেন।

তার নিজের জীবনও ছিল এক সংগ্রামের মহাকাব্য। পারিবারিক বিপর্যয়, চরম দারিদ্র্য এবং ক্ষয়রোগের সঙ্গে লড়াই করে তিনি কলম ধরে রেখেছিলেন। মাত্র চারটি মৌলিক গ্রন্থ—ধর্মের কাহিনী, নূরনবী, শান্তিধারা এবং মানব মুকুট—দিয়ে তিনি বাংলা গদ্যে যে শক্তি, মাধুর্য ও ভাবের গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা চিরস্মরণীয়। বিশেষ করে তার নূরনবী গ্রন্থটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে প্রশংসাবাণী লিখেছিলেন, তা তৎকালীন সাহিত্যাকাশে এক দুর্লভ স্বীকৃতি।