ঢাকা: সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সভার কার্যবিবরণী তৈরি এবং সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেছেন, সভার আলোচনা রেকর্ড করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রান্সক্রিপ্ট ও কার্যবিবরণী তৈরির জন্য সরকারের উপযোগী একটি নির্ভরযোগ্য এআই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে সভার সিদ্ধান্ত দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানো যাবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এর ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রূপান্তর মোকাবিলা: প্রয়োগ, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি দফতরগুলোতে প্রতিদিন একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক সময় সকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সভায় অংশ নিতে হয়। এসব সভায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হলেও ব্যস্ততার কারণে পাঁচ থেকে সাত দিন পরও কার্যবিবরণী তৈরি করা সম্ভব হয় না। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব হারায়।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে এআই ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সভার আলোচনা রেকর্ড হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি হবে। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত কাঠামো অনুসারে কার্যবিবরণীও প্রস্তুত করবে এআই। পরে সভার সভাপতি শুধু সিদ্ধান্তগুলো যাচাই করে অনুমোদন দেবেন। ফলে দিনে পাঁচটি সভা হলেও একই দিনে সব সভার কার্যবিবরণী সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে পাঠানো সম্ভব হবে। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পারস্পরিক জবাবদিহি তৈরি হবে।

ছবি : সংগৃহীত
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় প্রযুক্তির বিরোধিতা করা হলেও যেখানে মুনাফা ও প্রণোদনা থাকবে, সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বেই।
পোশাকশিল্পে রোবট ব্যবহারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় শ্রমের খরচ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে রোবট ব্যবহারে প্রাথমিক বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেশি। তাই এখনই সব ক্ষেত্রে রোবট ব্যবহার অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। তবে ভবিষ্যতে শ্রমিকদের মজুরি বাড়লে এবং প্রযুক্তির ব্যয় কমে এলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই রোবটিকসের দিকে ঝুঁকবে।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির কারণে কিছু প্রচলিত কর্মসংস্থান কমতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে নতুন খাত ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। তাই প্রযুক্তি নিয়ে হতাশ না হয়ে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকতে হবে।
বিশ্ববাজারে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ ও প্রত্যাশার প্রসঙ্গ তুলে আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে এসব প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কতটা প্রযুক্তি গ্রহণ করা হবে এবং কতটা নিজস্বভাবে উদ্ভাবন করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এ জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, সরকার একা কিংবা বেসরকারি খাত এককভাবে এআইয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের গবেষণায় অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো উদ্যোক্তা শিল্পের সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) জন্য অর্থায়ন করলে সেই অর্থের ওপর কর অব্যাহতির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় উদ্যোক্তারা দেশীয় গবেষণায় বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশ থেকে প্রযুক্তি বা সফটওয়্যার কিনতে বেশি আগ্রহী হবেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে সচিব বলেন, দেশে মেধা ও উদ্যোক্তার অভাব নেই। কিন্তু অনেক এসএমই প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছে না। সরকারি ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এ খাতে অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকলেও ঋণ নিতে গেলে জামানত দিতে হয়। অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে প্রয়োজনীয় জামানত দেওয়া সম্ভব হয় না।
এ সমস্যা সমাধানে ব্যবসায়ী সংগঠন ও চেম্বারগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সক্ষমতা, সততা ও অতীত কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংগঠন নিশ্চিত হলে ব্যাংকের কাছে ওই উদ্যোক্তার পক্ষে নিশ্চয়তা দিতে পারে। এতে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আস্থা বাড়বে এবং এসএমই খাতে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
এআই’র নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা আটকে রাখা যাবে না। তবে এর ব্যবহার যেন নৈতিক ও দায়িত্বশীল হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো ব্যবসা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এমন নীতিগত সহায়তা দেওয়া।
এআই নীতিমালা ও কৌশল প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগে কিংবা সীমিত পরিসরের কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে এ ধরনের নীতিমালা তৈরি করা যথেষ্ট নয়। সরকার, শিল্প খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন।
গত সেপ্টেম্বরে আয়োজিত ইনোভেশন ফেয়ারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, সেখানে জাতীয় উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষণা ও উন্নয়নে অর্থায়ন, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ, ব্যাংকঋণপ্রাপ্তি এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য নীতিগত প্রণোদনার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, এআই নীতিমালা ও কৌশল প্রণয়নের পাশাপাশি কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কাজ করা হবে। এ জন্য আনুষ্ঠানিক টাস্কফোর্সের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণে একটি উন্মুক্ত ও অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
উল্লেখ্য, দেশে প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সামিটের উদ্বোধন করা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সামিটের উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাণিজ্যিক ব্যবহার, দেশীয় উদ্ভাবন এবং এ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা।
সেমিনারে সঞ্চালনা করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। এতে আরও বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. জুলকারিন জাহাঙ্গীর, ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রাইসুল কবীর, রেভোরার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শুভ রহমান, মার্কোপলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবীন এবং পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ।