ঢাকা: বাংলাদেশকে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, বরং এআই প্রযুক্তির প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম দেশ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেছেন, ‘প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নিষ্ক্রিয় অংশীদার নয়, বরং সক্রিয় অংশীদার হতে হবে বাংলাদেশকে। এ জন্য এআই নির্ভর নয়, বরং এআই সক্ষম, উদ্ভাবনসমৃদ্ধ ও মানবকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।‘
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে এক মহাপরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আগামী দশকে দেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানও অনেকাংশে নির্ভর করবে এ প্রযুক্তিকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে তার ওপর।’
তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রযুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, রফতানি সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কোটি তরুণের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এআইকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। এই তরুণদের প্রযুক্তিবান্ধব ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তারাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে। এআইয়ের সুফল পেতে তরুণদের প্রযুক্তিতে দক্ষ ও সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’
আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক বছরে এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেরও এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। এ জন্য ব্যবসায়ী সমাজকে এআইকে শুধু ব্যয় কমানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং নতুন পণ্য ও সেবা তৈরি, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’
রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী সমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বে দেশকে একটি পরিচিতি দিয়েছে। একইভাবে দেশের তরুণরা যথাযথ দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারলে বিশ্বে বাংলাদেশকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।’
এআইয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে মূল্যবোধকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে। এতে নৈতিকতা, মানবাধিকার, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয় এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে।’
তবে শুধু সরকারি উদ্যোগে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
এআইয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি এর ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যখন শিক্ষিত বেকার, তখন এআই নতুন করে বেকারত্ব সৃষ্টি করবে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকি ও আশঙ্কাও রয়েছে। এ প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়, সে বিষয়ে প্রতিটি পর্যায়ে সতর্ক থাকতে হবে। এআইয়ের নিরাপদ ব্যবহার ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মানবসভ্যতা অস্তিত্বের সংকটেও পড়তে পারে।’
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘কোনো প্রযুক্তি গ্রহণের আগে সেটি কতটা টেকসই এবং দেশের জন্য কতটা উপযোগী, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করতে হবে। যে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হবে, তা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রযুক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে উপযোগী হয়, যখন তা মানুষের কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে কাজে লাগে।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (আইসিসি), বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।
এতে মূল বক্তব্য দেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক রেডিনেস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সাবেক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বক্তব্য দেন।