ঢাকা: বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আয়োজনের অপেক্ষায় তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের পর্যটন নগরী আন্তালিয়া। আগামীকাল সোমবার (৯ নভেম্বর) থেকে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলন কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ-৩১)। চলবে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত। সম্মেলন ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি, কূটনীতিক, পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠছে শহরটি।
আন্তালিয়ার আকসু এলাকায় অবস্থিত আনতালিয়া এক্সপো সেন্টারকে সম্মেলনের মূল ভেন্যু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আয়োজন, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, জলবায়ু আলোচনা, সংবাদ সম্মেলন ও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের কর্মসূচি ঘিরে সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবা প্রস্তুত করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত, আবাসন, নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের কাজের সুবিধাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
প্রস্তুতির কেন্দ্রে এক্সপো সেন্টার
কপ-৩১-এর মূল আয়োজনস্থল আন্তালিয়া এক্সপো সেন্টার। সম্মেলনের জন্য এখানে জাতিসংঘের ব্লু জোন এবং আয়োজক দেশের গ্রিন জোনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ব্লু জোনে থাকবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন ও জাতিসংঘের কার্যক্রম। অন্যদিকে গ্রিন জোনে থাকবে জনসাধারণের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম, প্রদর্শনী এবং জলবায়ু বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরার আয়োজন।
জাতিসংঘের স্বীকৃত অংশগ্রহণকারী ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য ব্লু জোনে প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান ও উদ্বোধনী আয়োজনে প্রবেশের ক্ষেত্রে আলাদা অনুমতি বা টিকিটের শর্ত থাকতে পারে।
আয়োজক তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্মেলনের প্রস্তুতি সমন্বয় করছে। দেশটির পরিবেশমন্ত্রী মুরাত কুরুম কপ-৩১-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর আলোচনার নেতৃত্বে থাকবেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিস বোয়েন। তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির বিশেষ ব্যবস্থায় এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সাংবাদিকদের জন্য ২৪ ঘণ্টার মিডিয়া সেন্টার
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের কাজের সুবিধায় সম্মেলনস্থলে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে মিডিয়া সেন্টার। সেখানে প্রায় ৩০০টি কাজের ডেস্ক এবং ল্যাপটপসহ ৪০টি ডেস্কের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সাংবাদিকদের জন্য তারযুক্ত ইন্টারনেট ও ওয়াই-ফাই সুবিধাও থাকবে।
এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলন, সাক্ষাৎকার, সরাসরি সম্প্রচার ও ভিডিও সংগ্রহের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে উন্মুক্ত অধিবেশনগুলোর সরাসরি সম্প্রচার এবং পরবর্তী সময়ে রেকর্ডিং দেখার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে কোনো সাংবাদিক সরাসরি কোনো অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে না পারলেও অনলাইনে তা অনুসরণ করতে পারবেন।
সম্মেলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন ও সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও সংগ্রহের জন্যও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের জন্য এসব সুবিধা সংবাদ সংগ্রহ ও তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন প্রকাশে সহায়ক হবে।
যাতায়াত ও আবাসনে বিশেষ ব্যবস্থা
আন্তালিয়ায় সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বিনামূল্যে শাটল বাস চালুর ব্যবস্থা করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দর, সম্মেলনের জন্য নির্ধারিত আবাসন এবং মূল ভেন্যুর মধ্যে এসব বাস চলাচল করবে। আবাসন এলাকা থেকে সম্মেলনস্থলে যেতে সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট সময় লাগতে পারে।
তবে শাটল বাসের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। বিনামূল্যের নির্ধারিত শাটল স্টপেজ থাকবে শুধু কপ-৩১-এর অফিশিয়াল আবাসন প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত হোটেলগুলোতে। অন্য হোটেলে অবস্থান করলে অংশগ্রহণকারীদের নিকটবর্তী শাটল স্টপেজে নিজস্ব ব্যবস্থায় যেতে হতে পারে।
এ ছাড়া আন্তালিয়ার শহর ও সম্মেলনস্থলের মধ্যে যোগাযোগের জন্য AntRay ট্রামসহ গণপরিবহনের সুবিধা রয়েছে।
বিশ্বনেতাদের সম্মেলন ১১ ও ১২ নভেম্বর
কপ-৩১-এর গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের মধ্যে রয়েছে বিশ্বনেতাদের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন। আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং বিভিন্ন দেশের জাতীয় বক্তব্য উপস্থাপনের কর্মসূচি রয়েছে।
এ সময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়ন, অভিযোজন, জ্বালানি রূপান্তর এবং বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়াই এবারের সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য।
আলোচনায় জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দাবি
কপ-৩১-এর আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর এবং জলবায়ু সহনশীলতা।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে তুলনামূলক কম দায়ী দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এবারের সম্মেলনে অভিযোজনের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা, জাস্ট ট্রানজিশন মেকানিজম এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ সভাপতিত্বের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনায় জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, টেকসই শিল্পায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ কপ-৩১
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও অতিবৃষ্টির মতো সমস্যার কারণে দেশের অর্থনীতি, কৃষি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে।
এ অবস্থায় আন্তালিয়ার সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ক্ষেত্র।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—
১. জলবায়ু অভিযোজনের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
২. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে সহায়তা পাওয়া।
৩. নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অবস্থান, আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সমঝোতা তাই সম্মেলনজুড়ে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
টেকসই সম্মেলন আয়োজনেও তুরস্কের উদ্যোগ
কপ-৩১ আয়োজনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সামনে এনেছে তুরস্ক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলন শুরুর আগেই তুরস্কের আয়োজন TS ISO 20121:2024 Event Sustainability Management System Certificate এবং Zero Waste Certificate অর্জন করেছে। কপ সম্মেলনের ইতিহাসে এ দুটি সনদ আগাম অর্জনের ঘটনাকে প্রথম হিসেবে উল্লেখ করেছে আয়োজক পক্ষ।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে সম্মেলন পরিচালনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং পরিবেশগত প্রভাব কমানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু কূটনীতির নতুন পরীক্ষায় আন্তালিয়া
আগামীকাল সোমবার (৯নভেম্বর) উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে কপ-৩১-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। উদ্বোধনী পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল, কপ-৩১-এর সভাপতি মুরাত কুরুম এবং আলোচনা বিষয়ক সভাপতি ক্রিস বোয়েনের।
একই দিনে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) জলবায়ু পরিস্থিতিবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশের কথাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে আগামী ১২ দিন আন্তালিয়া শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজক শহর নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু নীতি, অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিবেশগত সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাকেন্দ্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কতটা কমানো যায়, শেষ পর্যন্ত তার ওপরই নির্ভর করবে কপ-৩১-এর সাফল্য।