মৌলভীবাজার: জেলার বড়লেখা উপজেলায় গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তৈরি হয়েছে নতুন আইনি ও সামাজিক বিতর্ক। পরিবারিক গুরুতর অভিযোগ ও পুলিশের হাতে আসা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পরস্পরবিরোধী তথ্যের মধ্যে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, বিচারিক নিরপেক্ষতা এবং আইনি নথির গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞ ও সুশীল সমাজ।
ঘটনার পটভূমি ও পরিবারের অভিযোগ
২১ আগস্ট। উপজেলার মুড়িরগুল গ্রামের (৫ নম্বর ওয়ার্ড) বসতবাড়ির টয়লেটের টিনের চালার কাঠের তীরের সঙ্গে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মরিয়ম আক্তার মুন্নির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হচ্ছে— যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন মুন্নির ওপর নিয়মিত নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালিয়ে মুন্নিকে হত্যার পর বিষয়টিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে মেয়ের স্বামী ও শাশুড়িসহ ছয় জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের সংবাদ সম্মেলন ও বক্তব্য
ঘটনার খবর পেয়ে ওই সময় পুলিশ অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা (নম্বর-৩১) দায়ের করে এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে মরদেহ মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠায়। ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পায়। এর পর শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে বড়লেখা থানায় এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ওসি মনিরুজ্জামান।
সেখানে তিনি জানান, চিকিৎসকের প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে— ‘ঝুলে থাকার কারণে শ্বাসরোধে মৃত্যু হয়েছে এবং এটি আত্মহত্যাজনিত ঘটনা।’ সংবাদ সম্মেলনে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে চালানো প্রচারণায় কান না দিতে এবং কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।
নথি প্রকাশ ও আইনি নৈতিকতার প্রশ্ন
তবে ওসির এই সংবাদ সম্মেলন ও ময়নাতদন্তের গোপনীয় তথ্য মিডিয়ার সামনে তুলে ধরাকে কেন্দ্র করে সচেতন মহলে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি তদন্তাধীন এবং মামলাটি আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে তদন্ত কর্মকর্তা বা পুলিশ প্রশাসনের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির পক্ষ থেকে ময়নাতদন্তের গোপন নথি জনসমক্ষে আনা বা নিশ্চিত মন্তব্য করা পেশাগত আচরণের পরিপন্থী।
মিডিয়া ট্রায়াল ও বিচারকে প্রভাবিত করার ঝুঁকি
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) সিলেট জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান খন্দকার রানা সারাবাংলাকে বলেন, ‘একটি ফৌজদারি মামলার তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে বিচারকের রায় বা আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা আইনি নীতিমালার পরিপন্থী। পুলিশের এ ধরনের আগাম বক্তব্যে প্রকৃত ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ বা রেকর্ড করার আগে ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) রিপোর্ট বা কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আনা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করা আইনগতভাবে সংবেদনশীল এবং এটি তদন্তের স্বার্থে নিরুৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট একটি মামলার অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং এটি সরাসরি আদালতের নথিভুক্তকরণের জন্য নির্ধারিত।’
গোপন নথি ডিসক্লোজার
ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হলো আদালতের জন্য সংরক্ষিত একটি গোপনীয় দলিল (Case & Investigation Document)। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগে বা আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া এটি গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আনা প্রফেশনাল এথিকস ও প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট (পেশাগত অসদাচরণ) হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয়
মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই কোনো নির্দিষ্ট রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পুলিশের চূড়ান্ত মত প্রকাশ করার ফলে নিহতের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
পুলিশের বক্তব্য
গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নীর মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতেই পুলিশ সুপারের অনুমতি নিয়ে ময়নাতদন্তের তথ্যাংশ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির।
তিনি জানান, ঘটনাটি আত্মহত্যা না কি হত্যাকাণ্ড— তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র কনফিউশন ও উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছিল। সমাজে যেন কোনো বিভ্রান্তি বা বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সেজন্য জেলার পুলিশ সুপারের অনুমতিক্রমেই বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে।
ওসি আরও স্পষ্ট করেন যে, পুরো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হুবহু প্রকাশ করা হয়নি; কেবল চিকিৎসকের মূল পর্যবেক্ষণ (Suicidal in nature) টুকু ক্লিয়ার করা প্রয়োজন ছিল। অফিশিয়ালি রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর জনস্বার্থেই এই তথ্য জানানো হয়েছে এবং এতে কোনো আইনি বাধা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতি
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের অভিযোগটি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। এবং মামলা রেকর্ড হওয়ার পর আসামি ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) ও বিচারিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশের আগেই পোস্টমর্টেমের মতো সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ্যে আনা কতটা আইনসম্মত হয়েছে— তা নিয়ে এখন পুরো সিলেট জুড়ে চলছে সমালোচনা।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (২১ আগষ্ট) সন্ধ্যায় বড়লেখা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মুড়িরগুল গ্রামে সৌদি প্রবাসী মামুনুর রশীদ লাভলুর বাড়ি থেকে মুন্নীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।