সিলেট: সরকারি অর্থায়নে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ড্রাইভিং ও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও সিলেটের আলমপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়, স্বাস্থ্য সনদে জালিয়াতি, জ্বালানি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে ভাতা উত্তোলন এবং অনারিয়ামের নামে সরকারি অর্থ তছরুপের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রটির ট্রেনিং ইনচার্জ মাহবুব রহমান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, কোর্স শেষে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়া এবং বিআরটিএ থেকে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া এবং লাইসেন্স না পাওয়ার ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী।
বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন (বিআরটিসি) সেফটি প্রজেক্টের আওতায় পরিচালিত দুটি প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে এসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিবর্তে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে বিআরটিসি সিলেট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চার মাস মেয়াদি ‘মোটরযান ড্রাইভিং ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ’ কোর্স পরিচালিত হয়। এর একটি বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের পরিচালিত এসআইসিআইপি (সেসিপ) প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে ৮ হাজার দক্ষ চালক তৈরির কথা রয়েছে।
অন্যটি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়িত বিআরএসপি বা বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট।
প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীদের চার মাসের প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন যাতায়াত ও টিফিন ভাতা বাবদ ১৫০ টাকা এবং চার মাসের মেয়াদে এককালীন ১২ হাজার টাকা দেওয়ার কথা। কোর্স শেষে উত্তীর্ণদের বিআরটিসির স্বীকৃত সনদ ও পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সও বিনামূল্যে দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, আলমপুর বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এসব সুবিধার অনেকটাই বাস্তবে পাওয়া যায় না। বরং সরকারি বরাদ্দের অর্থ ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ নিয়ে অনিয়ম করা হচ্ছে।
ঘুষ ছাড়া মেলে না লাইসেন্স-পরীক্ষায় পাস
কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী জানান, চার মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ড্রাইভিং পরীক্ষা ও লাইসেন্স পাওয়ার সময় কোর্স ইনচার্জ মাহবুব রহমান তাদের সঙ্গে দরকষাকষি করেন। পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়া এবং বিআরটিএ থেকে লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
তাদের অভিযোগ, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া কিংবা লাইসেন্স পেতে হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের আরও অভিযোগ, টাকা দেওয়ার পরও অনেকে দীর্ঘ সময় ধরে সনদ ও লাইসেন্স পাননি। এমনকি সরকারি বরাদ্দের টিফিন ও যাতায়াত ভাতার টাকাও অনেক প্রশিক্ষণার্থী পাননি। পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘ফান্ড বন্ধ’ রয়েছে বলে তাদের জানানো হয়েছে।
‘ভুয়া ডাক্তার’ সেজে দেন স্বাস্থ্য সনদ
বিআরটিসির ভর্তি নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী, প্রত্যেক আবেদনকারীকে সিভিল সার্জন বা নিবন্ধিত সরকারি চিকিৎসকের কাছ থেকে নেওয়া স্বাস্থ্য সনদ জমা দেওয়ার কথা। তবে প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, আলমপুর কেন্দ্র থেকে তাদের সরকারি হাসপাতাল কিংবা নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছে না পাঠিয়ে কেন্দ্রেই স্বাস্থ্য সনদ তৈরি করে দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে কোর্স ইনচার্জ মাহবুব রহমান নিজেই চিকিৎসকের পরিচয় ব্যবহার করেন। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের একজন কর্মরত মেডিকেল অফিসারের নামে একটি সিল তৈরি করে সেটি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণার্থীদের স্বাস্থ্য সনদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে ওই সিলে থাকা বিএমডিসি নম্বর সরকারি ডাটাবেজে যাচাই করা হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরিবর্তে অন্য একজন চিকিৎসকের নাম পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ঘুষ লেনদেনের ভিডিও, ভয়েস রেকর্ড, বিকাশ লেনদেনের স্টেটমেন্ট ও স্বাস্থ্য সনদের কপিসহ বিভিন্ন নথি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
বরাদ্দের তুলনায় কম জ্বালানি দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ
ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মাঠপর্যায়ে গাড়ি চালানোর মাধ্যমে হাতে-কলমে শিক্ষা। এ জন্য প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থীর বিপরীতে সরকারি বাজেট থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ থাকার কথা।
প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় অনেক কম জ্বালানি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নামমাত্র কয়েক দিন গাড়ি চালানোর পর অব্যবহৃত জ্বালানির বিপরীতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে ভাতা তোলার অভিযোগ
কেন্দ্রটির হাজিরা খাতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের দাবি, নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা ব্যক্তিদেরও হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখানো হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো প্রশিক্ষণার্থী চার মাসের কোর্স চলাকালীন বিদেশে চলে গেলেও হাজিরা খাতায় তাকে নিয়মিত উপস্থিত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে টিফিন ভাতা ও অনারিয়ামের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ব্যাচের আসনের একটি অংশ ইনচার্জ ও তার সহযোগীদের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে পূরণ করা হয়। তাদের কেউ কেউ নিয়মিত প্রশিক্ষণে অংশ না নিয়েও সরকারি ভাতা ও ড্রাইভিং সনদ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বহিরাগত বিশেষজ্ঞ বা অতিথি শিক্ষক এনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার নামে ভুয়া নাম, ঠিকানা ও সই ব্যবহার করে সরকারি সম্মানীর অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে।
ভর্তি পরীক্ষার ফল নিয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি
নতুন ব্যাচে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রার্থী। সম্প্রতি বিআরটিসি সিলেট কেন্দ্রের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে বিআরএসপি প্রকল্পের দ্বিতীয় রাউন্ডে উত্তীর্ণ ২০০ জন প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন বঞ্চিত প্রার্থী।
ফাহাদ আহমেদ নাহিদ, মেহেদী হাসান আরিফ ও আরিয়ান আহমেদের অভিযোগ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় তারা ভালো করলেও প্রকাশিত ফলাফলে তাদের নাম নেই। তাদের দাবি, আগে থেকেই টাকা ও তদবিরের মাধ্যমে আসন নির্ধারণ করে রেখে লোকদেখানো পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মারজান হোসেন ও মাহবুব হাসান মুন্না অভিযোগ করেন, পরীক্ষার দিন রোল নম্বর ৫০১ থেকে ৫০৪-সহ একাধিক প্রার্থী উপস্থিত না থাকলেও তাদের উত্তীর্ণদের তালিকায় রাখা হয়েছে।
ঘুষ দিয়েও ৮ মাসে মেলেনি সনদ-লাইসেন্স
তৃতীয় রাউন্ডের প্রশিক্ষণার্থী দিপু সরকার বাবু ও এ এম আর তালুকদার অভিযোগ করেন, চার মাস প্রশিক্ষণ শেষ করেও তারা কোনো ভাতা পাননি। এমনকি লার্নার লাইসেন্সের জন্য ৩ হাজার টাকা দেওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে ঘুরছেন। তাদের দাবি, একই ধরনের প্রকল্পের আওতায় সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও মহিলা টিটিসির প্রশিক্ষণার্থীরা যথাসময়ে ভাতা ও ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছেন।
চেয়ারম্যানের বরাবর লিখিত অভিযোগ
গত ৩ আগস্ট ট্রেনিং ইনচার্জ মাহবুব রহমানের বিরুদ্ধে বিআরটিসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তাছলিমা আক্তার ও কুলসুমা বেগম নামের দুই নারী প্রশিক্ষণার্থী।
অভিযোগে তারা উল্লেখ করেন, পরীক্ষায় পাস করানো, সার্টিফিকেট ও লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলে মাহবুব তাদের কাছ থেকে কয়েক দফায় একজনের কাছ থেকে ১৩ হাজার ৪০২ টাকা এবং অন্যজনের কাছ থেকে ৯ হাজার ৫২৬ টাকা নেন। টাকা দেওয়ার আট মাস পরও তারা সনদ ও লাইসেন্স পাননি বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া ৩২ জন প্রশিক্ষণার্থীর পক্ষে টিম লিডার গোলাম সাদিকও বিআরটিসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে তিনি বলেন, পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাকে টিম লিডার বানিয়ে তার মাধ্যমে ৩২ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
দক্ষিণ সুরমার আরও তিন প্রশিক্ষণার্থী রাহাত, আদিল ও মাহফুজেরও একই অভিযোগ। তাদের দাবি, পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ঘুষের টাকা লেনদেনের ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে রয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন।
আগের অভিযোগও ছিল মাহবুবের বিরুদ্ধে
এর আগেও ট্রেনিং ইনচার্জ মাহবুব রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল আনসার-ভিডিপির ২৩ সদস্যকে বিআরটিএ পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তার বিরুদ্ধে ৫৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় আনসার ব্যাটালিয়ন শ্রীমঙ্গলের পরিচালকের কাছে একাধিক সদস্য লিখিত অভিযোগ করা হয়।
এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিআরটিসি সিলেট বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ম্যানেজার (অপারেশন ও ট্রেনিং) মো. রোকনুজ্জামান এবং ট্রেনিং ইনচার্জ (চালক) মাহবুব রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার মাহবুবের
এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে কোর্স ইনচার্জ মাহবুব রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয় এবং এসব বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
অন্যদিকে বিআরটিসি সিলেট বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ম্যানেজার (অপারেশন ও ট্রেনিং) মো. রোকনুজ্জামান বর্তমানে দাফতরিক কাজে বিদেশে অবস্থান করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
অভিযোগের বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।