সাতক্ষীরা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের নানা গল্প তুলে ধরতে গিয়ে ধীরে ধীরে কৃষির প্রতি তৈরি হয় আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই শুরু কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার পথচলা। এখন আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন তরুণ উদ্যোক্তা রাহাত রাজা।
পেশায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সাংবাদিক রাহাত রাজা পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন ‘বৃক্ষ বাড়ি’ নামের একটি কৃষি খামার। সেখানে চাষ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফসল। কৃষি নিয়ে কাজের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত তুলে ধরছেন কৃষির সম্ভাবনা, কৃষকের জীবন ও গ্রামীণ অর্থনীতির নানা দিক।

একসময় ক্যামেরা হাতে কৃষকের জীবন, ফসল উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির নানা গল্প তুলে ধরতেন নিজের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ ‘রাহাত রাজা ব্লগে’। কনটেন্ট তৈরির সেই পথ ধরেই কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার চিন্তা শুরু করেন তিনি।
রাহাত রাজা বলেন, ‘আমি রাজশাহীর একটি কুলবাগানে কনটেন্ট বানাতে গিয়েছিলাম। সেখানে ফিলিপাইন আখের চাষ দেখি। বিষয়টি দেখে আগ্রহ তৈরি হয়। পরে আমিরা এগ্রোর এক কৃষক ভাই আমাকে ফিলিপাইন জাতের কিছু আখের বীজ উপহার দেন। আমি সেগুলো আমার কৃষি খামারে রোপণ করি। আখ বড় হওয়ার পর ভালো লাভ হয়। এরপর সাতক্ষীরার কৃষকেরা আমার কাছ থেকে বীজ নেওয়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই আখের বীজ ছড়িয়ে পড়ে। এখন অনেক জায়গাতেই এ জাতের আখের চাষ দেখা যায়।’
রাহাত রাজার কৃষি উদ্যোগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের ফসল এবং তুলনামূলক লাভজনক কৃষি পদ্ধতিতে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে কৃষির বিভিন্ন দিক তুলে ধরছেন তিনি। ফলে কৃষিকাজের পাশাপাশি তার কনটেন্টও নতুন প্রজন্মের মধ্যে কৃষির প্রতি আগ্রহ তৈরি করছে।

রাহাত রাজা বলেন, ‘আমি মূলত কৃষি নিয়ে লেখাপড়া করেছি। কৃষি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে ছুটিনি। চেষ্টা করেছি নিজেই একটি কর্মসংস্থানের জায়গা তৈরি করতে, যেখানে আরও কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সেই উদ্দেশ্যেই এই বাগান করেছি। এখানে মূলত লাভজনক যেসব ফল ও ফসল আছে, সেগুলো চাষ করি। এর মধ্যে ফিলিপাইনের আখ অন্যতম।’
তিনি জানান, ফিলিপাইন জাতের আখ চাষে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। বছরভেদে এক থেকে দেড় লাখ টাকা, কখনো তারও বেশি লাভ হয়।
রাহাত রাজার উদ্যোগ দেখে সাতক্ষীরায় প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন জাতের আখ চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। বিশেষ করে ফিলিপাইন জাতের আখ চাষ করে সাড়া ফেলেছেন এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। আখের মিষ্টতা, আকার ও ফলনের কারণে বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে ফিলিপাইন জাতের আখ। অন্যান্য ফসলের তুলনায় কম সময়ে ভালো ফলন এবং তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার আশায় অনেক কৃষক এ জাতের আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
রাহাত রাজার দেখাদেখি ফিলিপাইন জাতের আখ চাষ করেছেন তার সহকর্মী রিজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘রাজার কাছ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি আখ চাষ করেছি। বিঘাপ্রতি আমার ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেই আখ বিক্রি করে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত লাভবান হতে পারছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই আখ চাষের মূল কারণ হলো এটি খুবই নরম, রসালো ও মিষ্টি। ফলে যেকোনো বয়সের মানুষ এটি খেতে পারে। এ কারণে আমরা এই চাষ ছড়িয়ে দিচ্ছি। এলাকার আরও অনেক মানুষ আমাদের কাছ থেকে আখের বীজ নিয়ে চাষ করছেন। আমরা অনলাইনেও এই আখের বীজ বিক্রি করছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘খামারবাড়ির পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মিত পরিচর্যা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ফিলিপাইন আখ উৎপাদন খরচ কমিয়ে নিরাপদ ও লাভজনক ফসলে রূপান্তরিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যারা স্বল্প পরিসরে এই আখ চাষ করতে চাচ্ছেন, আমরা কৃষি বিভাগ থেকে তাদের আখের বীজ দিয়ে সহযোগিতা করছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে।’