Tuesday 13 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরে লায়ন্স ক্লাব ও স্কুলকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব, আহত ৩

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২৪

রংপুর: রংপুর লায়ন্স ক্লাব এবং ঐতিহ্যবাহী রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণকাজ, আর্থিক লেনদেন, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ও সদস্যপদ নিয়ে কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও নথিপত্র চুরির অভিযোগের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের পালটাপালটি দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটির দুটি পক্ষ।

সোমবার (১২ অক্টোবর) নগরের পৃথক দুটি অভিজাত হোটেলে সময় ব্যবধানে পালটাপালটি সংবাদ সম্মেলন করে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেন মুখোমুখি অবস্থানে থাকা দুই পক্ষের নেতারা।

এর আগে গত ১০ অক্টোবর বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের পঞ্চম তলায় অবস্থিত ক্লাব কার্যালয়ে দফায় দফায় তালা ভাঙা ও নতুন তালা ঝোলানোর ঘটনা ঘটে। এ সময় বাধা দিতে গেলে নিরাপত্তা বিভাগের ইনচার্জ অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট গোলাম রব্বানী এবং নিরাপত্তাকর্মী পলাশ চন্দ্র দাস ও আশরাফুল ইসলামকে পিটিয়ে আহত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সোমবার বিকেলে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এক পক্ষ দাবি করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল ফটক টপকে সশস্ত্র বহিরাগতরা হামলা চালিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ক্লাব পরিচালক লায়ন এনামুল হক সোহেল ও লায়ন এ কে এম বানিউল আদম বাবু অভিযোগ করে বলেন, ‘গত ১০ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পাঠদান চলাকালে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বাধা দিলে তাদের বেধড়ক মারধর করা হয়।’

বক্তারা আরও জানান, হামলাকারীরা ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত লায়ন্স ক্লাবের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে তাণ্ডব চালায়। আসবাবপত্র ভাঙচুরে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করা হয় এবং ঘটনার সত্যতা গোপন করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

পূর্বে গভর্নিং বডির সদস্য ও শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রেক্ষাপটে গত ২১ সেপ্টেম্বর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও প্রশাসন তা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ক্লাব প্রেসিডেন্ট লায়ন মনজিল মুরাদ লাবলু। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

অপরদিকে একই দিন বিকেলে বিপরীত পক্ষের সংবাদ সম্মেলনে পালটা অভিযোগ তোলেন ২০২৬-২৭ মেয়াদের দাবিদার প্রেসিডেন্ট লায়ন ফরিদ আহমেদ রুমি ও সেক্রেটারি আকলাকুল ইসলাম তারেক, ট্রেজারার লায়ন শফিকুল ইসলাম স্বপন। অবৈধ ও পদহীন একটি গোষ্ঠী ক্লাব দখল করে রেখেছে উল্লেখ করে তারা শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়মের তথ্য লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরেন।

অভিযোগ করা হয়, প্রতিষ্ঠানের ২৬ শতাংশ জমি ক্রয়ে ৩ কোটি ৬১ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে বাহক চেকের মাধ্যমে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নগদায়ন এবং সরকারি গেইন ট্যাক্স ও আয়কর বাবদ ৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত তথ্য আগেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত উল্লেখযোগ্য আর্থিক অনিয়মের মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রাক্কলন ব্যতিরেকেই ২২টি চেকের মাধ্যমে ৫ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছে।

পিডব্লিউডির রেট সিডিউল তোয়াক্কা না করে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫ টাকা এবং ঠিকাদারি লভ্যাংশের ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ১৩৪ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের ভবনের নকশা অনুমোদনে কারচুপি এবং সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া ২৭টি শিক্ষক-কর্মচারী পদে মোটা অঙ্কের অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ তোলা হয়।

উত্থাপিত দুর্নীতির প্রতিবাদ করার কারণেই ৬ জন সাবেক সভাপতিসহ মোট ২৯ জন স্থায়ী সদস্যকে বিধিবহির্ভূতভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেন লায়ন নাজমুল আলম নাজু।

মনজিল মুরাদ লাভলু দাবি করেন, ২০২৬-২৭ মেয়াদের জন্য তিনি ক্লাবের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ফরিদ আহমেদ রুমি নামে এক ব্যক্তি সংগঠনের ই-মেইল ও সার্ভার হ্যাক করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট দাবি করছেন বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি আরও বলেন, ‘আবিদ আহমেদ রুমি ও আখলাকুর রহমান তারেক লায়ন্স ক্লাবের ওয়েবসাইটের পাসওয়ার্ড হ্যাক করে আমাদের ছবি ওয়েব থেকে তুলে নিজেদের ছবি দেয় এবং একটি কথিত কমিটি করে। যার মধ্যে রুমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা চেষ্টার মামলার আসামি। বিষয়টি নিয়ে আমরা সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছি।’

অন্যদিকে, ফরিদ আহমেদ রুমি নিজেকে ২০২৬-২৭ মেয়াদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দাবি করে বলেন, কিছু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কার্যালয়টি দখল করে রেখেছেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে কার্যালয়টি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তবে তারা চলে আসার পর ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল গিয়ে আবারও তালা ভেঙে নতুন তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। কার্যালয়ে হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অক্টোবর মাসের নিয়মিত সভা শেষে নিয়ম অনুযায়ী নিজের লাগানো তালা দিয়ে আমি চলে আসি। কোনো হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। বরং পদহীন সোহেল ও তার অনুসারীরা উল্টো তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।’

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। তবে সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনটি নির্দেশনাসহ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর