যশোর: যশোরে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, জেলা বিএনপির দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন জেলা প্রশাসক। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে প্রেস ক্লাব যশোর মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা জামায়াতের আমির ও যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসূল। এ সময় প্রকাশিত তালিকায় ডিলারদের নাম উল্লেখ করে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যশোরের ৯৩টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও দুর্নীতি হয়েছে। সরকারদলীয় উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং জেলা বিএনপির নেতাদের সহায়তায় অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অনেকে ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের নেতারা।
তাদের অভিযোগ, যশোরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য থাকলেও ডিলার নিয়োগে তাদের পরামর্শ ও সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার-বীজ মনিটরিং কমিটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কৃষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা থাকলেও জামায়াতের সংসদ সদস্যদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। বরং উপজেলা ও জেলা বিএনপির লোকজনকে কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন ডিলারের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় তুলে ধরে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। জামায়াতের নেতাদের দাবি, মনিরামপুর উপজেলার মেসার্স নাফিস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাসুদ পারভেজ রুবেল উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মফিজুর রহমান মফিজের ছেলে। ঝাঁপা ইউনিয়নের মেসার্স লাকি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোলাম আলী স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং অর্থের জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত। শ্যামকুড় ইউনিয়নের মেসার্স জামান ট্রেডার্সের মালিক সালাউদ্দিন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির ছেলে বলেও দাবি করা হয়।
এ ছাড়া মেসার্স সরদার এন্টারপ্রাইজের মালিক তবিবর রহমান রুমু উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টুর খালাতো ভাই এবং সাবেক আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ইয়াকুব আলীর কর্মী বলে অভিযোগ করা হয়। দোকান না থাকা সত্ত্বেও তিনি সার ডিলার হয়েছেন বলে দাবি করেন জামায়াতের নেতারা।
তাদের আরও অভিযোগ, চৌগাছা উপজেলার মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্সের মালিক সেলিম রেজা আউলিয়া পৌর বিএনপির সভাপতি। নওয়াপাড়ার মেসার্স মনিরুর ফারাজীর মালিক এফএম মনিরুর আলম উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার ফরাজীর ছেলে। ৯৩টি ইউনিয়নেই বিএনপির নেতাদের তালিকা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তালিকায় আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নামও রয়েছে বলে তারা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসকের পেশাদারিত্ব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে গোলাম রসূল বলেন, ‘সার-বীজ মনিটরিং কমিটি জেলা এবং উপজেলাতে এমপিদের কোনো কর্তৃত্ব, এমপিদের কোনো নাম রাখা হয়নি। জেলাতে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি হবে, সেখানে ডিসিকে সভাপতি করা হয়েছে। ডিসি রাজনৈতিক বিবেচনায় কৃষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব তিনজনকে রেখেছেন। আবার উপজেলা পর্যায়ে ১০ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি, সেখানে সভাপতি থাকবে ইউএনও; সেখানেও কৃষক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে। আমি কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য। আমি যশোরের জেলা প্রশাসককে স্পষ্ট বলেছি, আমরা এখানে পাঁচজন এমপি আছি, কেন জেলা পর্যায়ের তিনজনের মধ্যে আমার একজন লোক রাখা হয়নি? তখন ডিসি বলেছেন, সরকারের নির্দেশমতো তিনি কাজ করেছেন।’
গোলাম রসূল আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট বলেই দিয়েছেন, এই ডিলারশিপ বিএনপি ছাড়া কেউ পাবে না। কারণ ১৫ বছর ধরে বিএনপি নির্যাতিত হয়েছে, নিষ্পেষিত হয়েছে, কারাগারে গেছে। তাহলে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদীদের কাছে নির্যাতিত হয়েছে শুধুই বিএনপি? এই যশোরে ১ হাজার ২০০ মামলায় জামায়াতের হাজার হাজার কর্মী ছিল। আমরা বছরের পর বছর বাড়ি-ছাড়া থেকেছি। জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি ছিলো, আমাদের যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী আছে, সততা আছে, দক্ষতা আছে, তাদের ডিলারশিপ দেন। আমাদের কোনো নেতাকর্মীকে দেওয়া হয়নি।’
এ সময় অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘তাদের অভিযোগ অসংলগ্ন। এটা সঠিক যে, আবেদন আমাদের নেতাকর্মীরা বেশি করেছে। পেয়েছেও বেশি। তবে যাচাই-বাছাই করেছে জেলা প্রশাসন। নীতিমালা অনুযায়ী সঠিক না থাকলেও তো আর তারা ডিলার পায়নি। আমরা দলীয়ভাবেও কোনো হস্তক্ষেপ করিনি। রাজনীতিক দল হিসেবে বিরোধীদলের সবকিছুতেই বিরোধীতা করতে হয়—তাই জামায়াত বিরোধীতা করছে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য আজীজুর রহমান, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলী, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর সিদ্দিকী ও প্রচার সম্পাদক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাসসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।