ফরিদপুর: রাশিয়ায় মেকানিক্যাল শ্রমিক পদে চাকরির কথা বলে স্থানীয় দালালের আশ্বাসে গত ৮ মে রাশিয়ায় যায় ফরিদপুরের নগরকান্দা এলাকার যুবক রাজু মাতুব্বর (২৮)। সেখানে যাওয়ার পর রাশিয়ার সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাকে। সেখান সহকর্মী এক বাংলাদেশির মাধ্যমে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে রাজুর মৃত্যুর খবর।
রাজু ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কাইচাল ইউনিয়নের মাঝিকান্দা গ্রামের নান্নু মাতুব্বরের ছেলে। যুদ্ধক্ষেত্রে তার মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়ে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন রাতুল নামে বাংলাদেশি আরেক যুবক (রাশিয়ান যোদ্ধা)। এছাড়া তার সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃত্যুর বিষয়ে জানতে পারেন রাজুর ছোট ভাই রাজন মাতুব্বর। এরপর থেকে রাজুর পরিবারে চলছে শোক আর আহাজারি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর মৃত্যুর খবরে স্ত্রী শারমিন আক্তার আড়াই বছর বয়সের ছেলে ও এক বছরের মেয়েকে নিয়ে ননিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। স্বামীর প্রকৃত অবস্থা জানতে চান তার স্ত্রী। তিনি স্বামীর মৃত্যুর বিচার দাবি করেন।
ছেলের ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বৃদ্ধা বাবা নান্নু মাতুব্বর ও মা রাজিয়া বেগম। এ খবর শুনে বাড়িতে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। রাজুর মৃত্যুর বিষয়টি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি স্থানীয়দের। মৃত্যুর খবর সত্য হলে রাজুর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তারা।

রাজু মাতুব্বরের স্ত্রী এবং দুই সন্তান।
রাজুর পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী কফাইবালিয়া গ্রামের প্রিন্স মাতুব্বর ও তার ছোট ভাই রানার মাধ্যমে সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় ভালো কাজের চাকুরি চুক্তিতে রাজুকে রাশিয়ায় পাঠানোর হয়। এরমধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়। বাকি ১০ লাখ টাকা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পাননি রাজু। পরিবারের দাবি, তাকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রিন্স ও রানাকে দায়ী করছেন স্বজনেরা।
রাজুর বাবা নান্নু মাতুব্বর বলেন, ‘ভালো চাকরির আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর খবর পান। এখন ছেলের মৃত্যুর খবর শুনেছেন। তিনি ছেলের প্রকৃত অবস্থা জানতে চান। একই সঙ্গে এ ঘটনার বিচার দাবি করেন।’
এদিকে, ফেসবুকে রাতুল নামের এক যুবকের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, রাজু মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন রাতুল। ভিডিওতে রাজুর ছবি যুক্ত করে রাতুল বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আমাদের আরেকটি ভাইকে হারিয়েছি, যার নাম রাজু মাতুব্বর।’

সন্তানের ছবি দেখিয়ে কাঁদছেন রাজুর বাবা-মা।
ভিডিওতে রাতুল জানান, রাজু তার পরিচিত ছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর ব্যস্ত থাকায় রাজুর সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায় তার। এরমধ্যে রাজুর ছোট ভাই তাকে মেসেজ পাঠিয়ে জানায়, রাজু ১০ থেকে ১২ দিন যাবৎ নিখোঁজ। তাই আমি রাজুর ছোট ভাইয়ের নিকট থেকে ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করি এবং জানতে পারি রাজু মারা গেছে।’
তবে রাজুর প্রকৃত অবস্থা জানতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর হস্তক্ষেপ চেয়েছে পরিবার। এছাড়া রাজুর মৃত্যুর খবরটি এখন পর্যন্ত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। জীবিত আছেন, নাকি মারা গেছেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, রাজু যে অবস্থায় থাকুক তাকে তথ্য নিশ্চিত করে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
রাজুর পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত প্রিন্স মাতুব্বরের ছোট ভাই রানা জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে রাজুকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। রাজু নিজেই রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে যান। তাকে প্রতারণা করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন রানা।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মোহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। রাজুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।