সাতক্ষীরা: চারদিকে নোনা পানি, স্থলভাগের মাটিতে লবণাক্ততা। সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে এমন বাস্তবতা নতুন নয়। ফলে পানীয় জলের পাশাপাশি কৃষিকাজ ও গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় পানির অভাব এখানকার নিয়মিত চিত্র।
এমন প্রতিকূল পরিবেশে সবজি চাষ ছিল উপকূলের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার নারীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও মাচা পদ্ধতিতে ঝুলছে সবজি, ব্যাগে মাটি ভরে হচ্ছে আদা চাষ, আবার কোথাও মাদা ও বেড পদ্ধতিতে ফলছে পালংশাক, বেগুন ও ঢ্যাঁড়স। চারদিকে নোনাপানির মধ্যেও সবুজের এমন সমারোহ যেন সম্ভাবনার নতুন গল্প।
তেমনি একজন সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলি গ্রামের দিপীকা রাণী। পেশায় গৃহিণী। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন বাড়ির আঙিনায় সবজি খামার। সেখানে চাষ করেছেন আধুনিক পদ্ধতিতে মিষ্টি পানির ফসল।
সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “সুন্দরবন এলাকাটি লবণাক্ততাকবলিত। এখানে আগে আমরা ঠিকঠাক শাকসবজি চাষ করতে পারতাম না। আগে শাকসবজি লাগালে মাটি লবণাক্ত থাকায় সেগুলো মরে যেত। তবে এখন আমরা ‘লিডার্স’ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেছি।”
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার বাড়ির আঙিনায় মিষ্টি পানির আধার করেছি। সেখানে সারা বছর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করি। সেখান থেকে আমি খাওয়ার পানিসহ গৃহস্থালির সব কাজ সম্পন্ন করতে পারি। পাশাপাশি সবজি চাষেও সেই মিষ্টি ব্যবহার করতে পারি।’

সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলায় বাড়ির আঙিনায় সবজি খামার। ছবি: সারাবাংলা
দিপীকা রাণী বলেন, ‘বাড়ির আঙিনায় পুকুর কেটে মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছি। বেড পদ্ধতি, মালচিং পদ্ধতি, বস্তা পদ্ধতি, ভার্টিক্যাল টাওয়ার পদ্ধতি, ভার্টিক্যাল টাওয়ার ড্রিপ সেচ পদ্ধতি, আলোর ফাঁদসহ ১২টি পদ্ধতিতে আমি সবজি চাষ করেছি। সবজি উৎপাদন করে স্বামীর কাছে দিই বাজারে বিক্রির জন্য। প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজির বেশি সবজি বাজারে বিক্রি করি।’
একই গ্রামের ইতি বিশ্বাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি দিপীকা দিদির দেখাদেখি বাড়ির আঙিনায় জমিতে সবজি চাষ করেছি। প্রথমে সবজির চারাগুলো মরে গিয়েছিল। কয়েক দফা পর সফল হয়েছি। দিদির দেখাদেখি আমিও চাষ করেছি ঢ্যাঁড়স, পুঁইশাক, বস্তার ভেতরে আদা, উচ্ছে, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পালংশাক ও লালশাক। তবে সবকিছু আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করা হয়েছে, যাতে লবণাক্ত পানি সেই মাটি স্পর্শ করতে না পারে। পুকুর কেটে আমরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে রাখি। আর সেই পানি ব্যবহার করি।’
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও সুপেয় পানির সংকট কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে চিংড়িঘের ও নোনা পানির আধারের কারণে। তবে সেগুলোকে উপেক্ষা করে সেখানে বসতভিটায় সবজি চাষ করে সফল হচ্ছেন স্থানীয় নারীরা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশালতা সারাবাংলাকে বলেন, “শ্যামনগর উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নের জমিই লবণাক্ত। এই লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় কৃষির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা নিয়মিত চাষাবাদ ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে আমরা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘লিডার্স’র সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। এখানে সরকারি ও বেসরকারি উভয়পক্ষই সমন্বিতভাবে ভূমিকা রাখছে।’

সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলায় পুকুর পাড়ে সবজি খামার। ছবি: সারাবাংলা
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তারা আমাদের বিভিন্ন উন্নত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়। সেই প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও বিভিন্ন আধুনিক কৃষি পদ্ধতি অবলম্বন করে আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। লবণ-সহনশীল জাতের ফসল ও সার ব্যবহারের পাশাপাশি বেশ কিছু বিশেষ প্রযুক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে চাষাবাদে। মাচা পদ্ধতি, মালচিং পদ্ধতি এবং বস্তায় সবজি চাষ পদ্ধতিতে চাষ করছে বিভিন্ন রকম সবজি। এই বৈচিত্র্যময় ও আধুনিক কৌশলগুলো কাজে লাগিয়ে লবণাক্ত এলাকাগুলোতে সফলভাবে সবজি চাষ সম্প্রসারণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
‘লিডার্স’র নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল সারাবাংলাকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন। বিশেষ করে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি, খরা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে এই এলাকার মানুষ প্রথাগত কৃষিকাজ করতে পারছে না। তাই আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এই এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এই প্রশিক্ষণ পেলে তারা লবণ-সহনশীল ধান ও সবজি বীজ উৎপাদন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব বা ইকোলজিক্যাল এগ্রিকালচার প্রমোশনের জন্য অর্গানিক সার ও জৈব বালাইনাশক কীভাবে তৈরি করতে হয়। সে বিষয়েও আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এ ছাড়া, ফসল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চাড়ি, কেঁচো ও গোবর কিনে দিচ্ছি, যাতে পরবর্তী সময়ে তারা এগুলো নিজেরাই তৈরি করতে পারে।’
মানুষের স্থানীয় জ্ঞানের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে বিজ্ঞানসম্মত কিছু প্রযুক্তি স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান মোহন কুমার মন্ডল।