সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের শাল্লায় জমির দখল নিয়ে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর প্রতিপক্ষের প্রায় ৪০টি বাড়িতে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা গ্রেফতারের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ফাঁকা বাড়িগুলোতে লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের। তাদের দাবি, ধান, চাল, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র, কৃষিযন্ত্র, গবাদিপশু ও নৌকাসহ অন্তত অর্ধকোটি টাকার সম্পদ লুট করা হয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রামে জমির দখল নিয়ে রূপ মিয়া ও আজব আলীর পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে রূপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান নিহত হন। এরপর পুলিশের গ্রেফতারের ভয়ে আজব আলীর পক্ষের লোকজন গ্রাম ছেড়ে চলে যান। তাদের বাড়িঘরে লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তিনদিনে আজব আলীর পক্ষের এলিম উদ্দিনসহ প্রায় ৪০টি বাড়ি থেকে ৬৫টি গরু, চাষাবাদের পাঁচটি পাওয়ারটিলার, দুইটি মোটরসাইকেল, পানি তোলার পাঁচটি মোটর, ডিজেলচালিত ২০টি ইঞ্জিন, দুইটি ধানমাড়াইকল, শতাধিক বস্তা বোরো বীজধান, প্রায় ৪০০ মণ বোরো ধান, দুইটি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, নগদ ৫ লাখ টাকা এবং ৩ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে। এ ছাড়া গৃহস্থালির বিভিন্ন জিনিসপত্র ও হাঁড়িপাতিলও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুরুষ সদস্যরা বাড়ির বাইরে থাকায় নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
নিজগাঁও গ্রামে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, গ্রামের পাশের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে রাতে গ্রামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান।
নিজগাঁও গ্রামের মৃত উমর আলীর স্ত্রী মিনারা বেগম বলেন, ‘রাতে এসে ঘরের দরজা খোলার জন্য অনেক লাথি দিয়েছে, ঘরের বেড়ায় লাথি দিয়েছে, গালিগালাজ করেছে কিন্তু ভয়ে আমরা দরজা খুলছি না। ঘরের বাইরে থাকা দুইটা মেশিন, চারটি গরু ও একটা নৌকা ছিল—নিয়ে গেছে।’
মাসুম মিয়ার স্ত্রী মোছা. আসমিনা বেগম বলেন, ‘বাড়িঘরের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। তিনদিনের লুটপাটে আমরা এখন পথের ফকিরের সমান হয়ে গেছি। ৪০০ মণ ধান, ২০ মণ চাল, তিন ভরি সোনা, ১৭টা গরু, নগদ ৫ লাখ টাকা, ফ্রিজ, পানি তোলার মটর, মোটরসাইকেল, ট্রলি, ধান ভাঙ্গানোর মেশিনসহ ঘরে যা ছিল সব নিয়ে গেছে। আমরা এখন চলব কীভাবে?’
রেজু মিয়ার স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, ‘আমার ও আমার শাশুড়ির খাট, আলমারি, ঘরের সব জিনিসপত্র, হাড়ি-পাতিল, ধান-চাল, জমিতে পানি দেওয়ার পাম্প নিয়ে গেছে লুট করে। রান্নার সব চুলা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। রান্না করার মতো কোনো কিছু নেই ঘরে।’
আহাদ নুর মিয়ার স্ত্রী লিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কোনো বাড়িতেই পুরুষমানুষ নেই। খালি বাড়ি থেকে গরু-বাছুর, ধান-চাল সব নিয়ে গেছে। এখন পানি খাওয়ার একটা গ্লাসই নাই। অনেক খড় ছিল, গভীর রাতে আগুন দিয়ে খড়গুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।’
পুলিশের ভয়ে গ্রামছাড়া এলিম উদ্দিনের বাড়ি দেখতে তার ছোটো বোন মাহমুদা আক্তার এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা আমাদের জীবনেও দেখিনি। খালি বাড়িতে মহিলাদের গালিগালাজ করে ও হুমকি দিয়ে সব লুটপাট করেছে। মারামারিতে আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর রূপ মিয়ার লোকজন আমাদের ভাইদের পক্ষের প্রায় ৪০টা ঘরের কোনো কিছু লুট করার বাকি রাখেনি।’
তবে লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রূপ মিয়া। তিনি বলেন, ‘জমিটি আমার বাবার নামে, আমি মাটি দিয়ে ভরাটও করেছি। এখন আজব আলী দাবি করে এই জায়গা তার। আজব আলীর লোকজনের হামলায় আমার ভাই মারা গেছে ও ৩০-৪০ জন আহত হয়েছে। আমার বাম পা ও মাথায় গুরতর আঘাত লেগেছে। আমি বিছানা থেকে উঠতে পারি না।’
লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কেউ প্রতিপক্ষের বাড়িঘর লুটপাট করেনি, অন্যের জিনিসপত্র আনতে কড়া নিষেধ করা হয়েছে। তারা নিজেরাই আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে মালামাল পাচার করে আমাদেরকে অভিযুক্ত করছে। পুলিশকে আমরা জানিয়েছি যারাই এসবের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন।’
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘মারামারির পর রাতের আধারে নিজগাঁও গ্রামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে সত্যি। তবে কে বা কারা করছে আমরা জানি না। একটি বাড়ির বিশাল খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে। অনেকেই জানিয়েছে, ধান, চাল, পাওয়ারটিলার ও ইঞ্জিন লুট করে নিয়ে গেছে।’
শাল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর নিজগাঁও গ্রামে পুলিশ যাওয়ার আগে কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখন গ্রামের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাতে এমন ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে। সবার বাড়িঘরে পুলিশের যাওয়া কঠিন। তবে পুলিশ এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’