রংপুর: নগরীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ১২টি ‘কামলার হাট’। এই হাটগুলোতে প্রতিদিন ১২০–১৫০ জন দিনমজুর কাজের আশায় জড়ো হলেও গত এক মাস ধরে অধিকাংশ দিনই খালি হাতে ফিরছেন। গ্রামে কৃষিকাজ ও শহরে নির্মাণকাজ কমে যাওয়া এবং সরকারের ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পের বরাদ্দ না আসায় শ্রমিকদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেকেই চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। কর্মসৃজন প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রকল্প শুরুই হয়নি।
দিনমজুরদের ভিড় বাড়লেও মিলছে না কাজ
ভোরের আলো ফোটার আগেই কোদাল, কাস্তে, দা, টুকরি আর রশি হাতে রংপুর নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হন দিনমজুরেরা। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ‘কামলার হাটে’ কাজ মিলছে না। মাটি কাটা, ইট-বালু ও পাথর বহন, বাঁশের বেড়া তৈরি কিংবা অন্য যেকোনো দিনমজুরির কাজের আশায় অপেক্ষা করলেও অধিকাংশ দিনই তাদের ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।
নগরীর অন্তত ১২টি পয়েন্টে প্রতিদিন বসে ‘কামলার হাট’। এর মধ্যে গণেশপুর, শাপলা চত্বর, স্টেশন রোড, মডার্ন মোড়, সাতমাথা, মাহিগঞ্জ, দর্শনা, টার্মিনাল, নজিরহাট, তাজহাট, লালবাগ ও চিকলি এলাকা উল্লেখযোগ্য। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শ্রমিকেরা সেখানে অপেক্ষা করেন; কেউ দৈনিক মজুরিতে, কেউ চুক্তিতে কাজে যান।
কাজের সংকটে ঋণের বোঝা
শ্রমিকদের ভাষ্য, গত এক মাস ধরে কাজের তীব্র সংকট চলছে। আগে সপ্তাহে অন্তত চার দিন কাজ পাওয়া যেত; এখন অনেকের ভাগ্যে জুটছে মাত্র এক-দুই দিন। প্রতিটি হাটে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০ জন দিনমজুর আসেন, যাদের অধিকাংশই গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামে কৃষিকাজ ও অন্যান্য দিনমজুরির কাজ কমে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে তারা শহরে আসছেন।
গণেশপুর হাটে কথা হয় বদরগঞ্জের পঞ্চাশোর্ধ্ব শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে তিনি জানান, গত এক মাসে মাত্র পাঁচ দিন কাজ পেয়েছেন; বাকি ২৫ দিনই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, ‘চড়া সুদে ঋণ নিয়ে খুব কষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে।’
একই হাটে অপেক্ষারত মইনুদ্দিন মিয়া সারাবাংলাকে জানান, গত এক সপ্তাহে মাত্র দু’দিন কাজ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাটে বসে থাকি। কিন্তু কেউ শ্রমিক নিতে আসে না। আয় না থাকলে সংসার চালাব কীভাবে? বাধ্য হয়ে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়’।
রংপুর সদরের দেওডোবা ডাঙ্গিরপাড় গ্রাম থেকে শাপলা চত্বরে আসা মনোয়ারুল ইসলাম জানান, আগে কখনো এমন কাজের অভাব দেখেননি। মমিনপুরের লালবাবু বর্মণ সারাবাংলাকে বলেন, ‘দিনমজুরি ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ নেই; কাজ না থাকলে আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।’ গণেশপুর হাটে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ দিনমজুর ভূমিহীন; কারও কারও বসতভিটা থাকলেও আবাদি জমি নেই।
কর্মসৃজন প্রকল্পের বরাদ্দ না আসায় অনিশ্চয়তা
ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদফতর সূত্র অনুসারে, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার প্রায় ৬৮ হাজার হতদরিদ্র পরিবার তালিকাভুক্ত রয়েছে। প্রতি বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে এ অঞ্চলে কর্মসংকট দেখা দেয়। সে সময় তালিকাভুক্ত প্রতিটি পরিবার থেকে একজন সদস্য সরকারের ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় কাজ পান; সপ্তাহে পাঁচ দিন দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজের সুযোগ দেওয়া হয় তাকে।
জানতে চাইলে রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বছর কর্মসৃজন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। যে কারণে প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু করা যায়নি।’ বিগত বছরগুলোতে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই বরাদ্দ চলে এলেও এ বছর বরাদ্দ পাওয়া যাবে কি না, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন।
স্বস্তির আশা আমন মৌসুমে
শ্রমিকদের ভাষ্য, আমন ধান পাকতে শুরু করেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হবে। এরপর আলু, ভুট্টা ও শীতকালীন সবজি চাষের মৌসুম শুরু হলে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসেম আলীর মতে, এলাকায় নির্মাণকাজ আগের মতো না হওয়ায় কাজের সুযোগ কমে গেছে। তবে কর্মসৃজন প্রকল্পের বরাদ্দ না এলে এবং শহরে নির্মাণকাজ চালু না হলে দিনমজুরদের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।